বিপদে মোরে রক্ষা করো
এই নহে মোর প্রার্থনা।
বিপদে আমি, না যেন করি ভয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানব সভ্যতার সামনে সমূহ বিপদ, করোনাভাইরাস। অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম। সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট।
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী, এখন অসহায় সামান্য একটা চোখের নজরে না আসা জীবাণুর ভয়। আমি যখন ভারতবর্ষে বসে এই আর্টিকেলটা লিখছি তখন, বিশ্বের 190836 জন মানুষ করনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে আমরা হারিয়েছি 7527 জন সহ নাগরিককে। কালকে, 12 ঘন্টা পর, অথবা এক ঘন্টা পর, এই পরিসংখ্যান কি হারে বাড়বে বা কমবে তা আমি জানিনা।
আমি এও জানি না যে, করোনা মুক্ত নতুন বিশ্বের সূর্যদয়, আমি দুচোখ ভরে দেখতে পারবো কিনা।
করনা ভাইরাসে আক্রান্ত এই বিশ্বের একজন নাগরিক হিসেবে, করোনা ভাইরাস কে ভয় পাওয়ার বদলে আপনি অনেক কিছু শিখেছেন এই সংকটের মুহূর্ত থেকে। একবার চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করুন। দরকার নেই, আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি। করোনাভাইরাস আমাদের কি শিক্ষা দিয়ে গেল?
করোনাভাইরাস কে হারানোর পর নতুন বিশ্ব এক নতুন জীবন খুঁজে পাবে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে জীবনের অর্থটা হারিয়ে গেছিল। এই সংকটের মুহূর্ত, আমাদের শিক্ষা দিল জীবনের মূল্য, বাঁচার অর্থ, প্রতিমুহূর্তে প্রাণোচ্ছল ভাবে জীবন যাপন করার অনুপ্রেরণা।
এই নৃশংস নির্দয় ভাইরাস আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেল, পরিবারের সাথে সময় কাটানো কাকে বলে। আমাদের পরিবার আমাদের কাছে কতটা মূল্যবান। আমাদের বাবা-মা স্ত্রী স্বামী সন্তান ঠিক কতটা অমূল্য আমাদের জীবনে। তাদের হারানোর ভয় আমাদের মধ্যে ঠিক কতটা তীব্র! যার পোশাকি নাম ভালোবাসা।
এর আগে, আমরা অবসর সময়টা পার্টি করতে, সিনেমা দেখতে, ঘুরে বেড়াতে, শপিংমলে যেতে, অথবা মোবাইলের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে সময় কাটাতাম। কিন্তু করোনাভাইরাস শিখিয়ে দিয়েগেল সম্পর্ককে সময় দেওয়াটা আমরা ভুলে গেছিলাম। শিখিয়ে দিয়ে গেল সম্পর্ককে সময় দেওয়াটা ঠিক কতটা জরুরি।
বিশ্বের নানা প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে আজ গৃহবন্দি। এই গৃহবন্দী দশা তৈরি করেছে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুটি। করোনা শিখিয়ে দিয়ে গেল, পরাধীনতার বন্দিদশা কাকে বলে। শিখিয়ে দিয়ে গেল, স্বাধীনতার স্বাদ ঠিক কতটা অমূল্য। দেখলো পরাধীনতার জ্বালা। শিক্ষা দিল গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মাহাত্ম্য।
করোনা ভাইরাস আক্রমণ করার পর বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো, তাদের কর্মচারীদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা ঘরে বসে অফিসের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। কোম্পানিগুলি ক্রমাগত গবেষণা করে চলেছে এই করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সঙ্কট ঘন মুহূর্তে, অফিসে না গিয়েও কিভাবে প্রোডাকশন স্বাভাবিক রেখে, অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।
করোনাভাইরাস শিখিয়ে দিয়ে গেল, লক্ষ্য লক্ষ্য কোটি কোটি টাকার পেট্রোল পুড়িয়ে প্রাইভেট বা পাবলিক পরিবহন পরিষেবা গ্রহণ না করেও অফিস পরিচালনা করা যায়। গাড়ির ধোঁয়া, ট্র্যাফিক জ্যাম, এসবের ঊর্ধ্বে উঠেও আগামী বিশ্বের বেশ বড় অংশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান হয়তো ওয়ার্ক ফ্রম হোম অপশনটা গ্রহণ করবে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণের হার কমানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে পেট্রোল ডিজেলের মত মূল্যবান জ্বালানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকার ইলেকট্রিকের বিল বাঁচানো যাবে। নিজের বাড়ির স্বচ্ছন্দ পরিবেশে কাজ করার সুবাদে কর্মচারীদের কাজের প্রতি আরো নিষ্ঠাবান করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে উৎপাদন ও বজায় রাখা যাবে সমানতালে।
করোণা জাতের নামে বজ্জাতি করেনি। করোনা ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ করেনি। করোনাভাইরাস ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা অথবা সাধারণ মানুষদের সাধারণ ভেবে তাচ্ছিল্য করেনি। লক্ষ্য লক্ষ্য কোটি টাকার সম্পদ যদি কারো কাছে থাকে তাহলেও তাকে মাফ করেনি করোনা। আবার রাস্তায় পরে থাকা, ডাস্টবিনের এঁটো কাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকা, ভিখারিও করুণা পায়নি করোনা ভাইরাস এর কাছ থেকে। প্রজাতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক সাম্য বলতে কী বোঝায়, তার শিক্ষা দিয়ে গেল করোনা ভাইরাস।
করোনা ভাইরাস আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল। প্রথম বিশ্বের দেশ, দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ, তৃতীয় বিশ্বের দেশ। পৃথিবীর সুপার পাওয়ার, পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। এগুলো সব ফেক। প্রকৃতির কাছে কতটা অসহায় এবং হাস্যকর আমাদের এই দেশগত উন্নয়নের নামে গর্বের মিথ্যা ফানুস।
যত উন্নতমানের মিসাইল তোমার কাছে থাক, যত উন্নতমানের পরমানবিক শক্তি সম্পন্ন ধ্বংসলীলার অস্ত্র তোমার হাতে থাকুক। এতে কোনো কাজ হবে না। অস্ত্র নয় ওষুধ আবিষ্কার করো। ধ্বংসের হাতিয়ার নয়, সভ্যতা বাঁচানোর হাতিয়ার চাই। আত্মরক্ষার জন্য ওষুধ তৈরি কর, হে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি মানুষ।
কাল পর্যন্তও মানব সভ্যতার বিভিন্ন দেশের মানুষেরা, অহংকার এর সুরে বলতো, আমরা চন্দ্রবিজয় করেছি, আমরা মঙ্গল গ্রহ জয় করেছি। সূর্যের সবথেকে কাছে গেছে আমাদের রকেট। আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস সাত দিন আগে বলে দিতে সক্ষম। অসংখ্য স্যাটেলাইট আছে আমাদের হাতে। প্রকৃতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু, চোখের নজরে না আসা সামান্য একটা জীবাণু মানব সভ্যতার অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। এই মরন ভাইরাস যেন বাণী শুনিয়ে গেল, হে মানব সভ্যতা আত্মতুষ্টিতে নিজেকে ধ্বংস করো না। বিজ্ঞানের উন্নয়নের শিখরে ওঠার জন্য আরো অনেক অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে তোমাকে। করোনা ভাইরাস চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে গেল, মানব সভ্যতার বিজ্ঞান, তোমার আরো অনেক অনেক বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন।
আমরা যে এতদিন লিঙ্গ বৈষম্য, ধর্ম বৈষম্য, অর্থ বৈষম্য, জাত বৈষম্য, বর্ণ বৈষম্য, ইত্যাদি বিভিন্ন ভ্রান্ত অহংকার এর মধ্যে থেকে একে অপরের সাথে অন্যায় করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত হয়তো এই ভাবেই আমাদের করালো করোনা ভাইরাস।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী গবেষক অধ্যাপক গাব্রিয়েল লীয়ং এর গবেষণা অনুযায়ী বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গোটা বিশ্বের 40 থেকে 70 শতাংশ মানুষ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই করোনা ভাইরাসের দ্বার আক্রান্ত হবেন। অর্থাৎ বিশ্বময় 300 কোটি থেকে 525 কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এর মধ্যে যদি এক পারসেন্ট মানুষ ও এই রোগের সাথে লড়াই করতে অক্ষম হন, তাহলে হিসেব অনুযায়ী আমরা আমাদের চার কোটি থেকে সাড়ে চার কোটি সহ নাগরিককে হারাতে চলেছি। চার কোটি থেকে সাড়ে চার কোটি, অংকটা কিন্তু বেশ বড় মাপের।
সব সংকট এরই একটা সমাপ্তি আছে। বিশ্ব এই সংকট থেকে খুব শীঘ্রই বেরিয়ে আসবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমরা সবাই সচেতন ভাবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে যদি থাকি, তাহলেই বিজয় লাভ করতে পারব করোনা ভাইরাসের মরণ ফাঁদ থেকে। করনা মুক্ত বিশ্বের সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য অবশ্যই আমাদের হবে। আর সেই নতুন সূর্যোদয়ের পবিত্র প্রভাতে আমরা চিৎকার করে বলবো,
আমরা অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসেছি।
আমরা মৃত্যুর থেকে অমৃতের পথে এসেছি।
আমরা আমাদের ভুল বুঝেছি।
আমরা আমাদের ভুলগুলো সংশোধন করেছি।
নবজাতকের কাছে আমরা উপহার দিতে পেরেছিস এক সভ্য সভ্যতা।

