Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
সিকিম-বাংলা সীমান্তের শেষ গ্রাম ‘মেঘের দেশ’ কাশ্যেন

সিকিম-বাংলা সীমান্তের শেষ গ্রাম ‘মেঘের দেশ’ কাশ্যেন

অফবিট কাশ্যেনে ঘন জঙ্গলের কোলে ‘ট্রাভেলাইটস হিল স্টে’- ভ্রমণপ্রেমীদের ছুটি কাটানোর ঠিকানা

Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কাশ্যেন (কালিম্পং), ১৮ এপ্রিল: গ্রীষ্মের তীব্র দাবদহে যখন মানুষের প্রাণ অতিষ্ঠ তখন যদি ঘরের কাছে ঠান্ডার জায়গার খোঁজ পাওয়া যায় কেমন হয় বলুন তো?  আর সেটা যদি হয় অফবিট তাহলে তো সোনায় সোহাগা। এমনই একটি জায়গার কথা আমি আপনাদের বলছি। জায়গাটি অন্য কোথাও নয়, একেবারে আমাদের বাংলার মধ্যেই অবস্থিত। কালিম্পং থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। ‘মেঘের দেশ’ বলে পরিচিত এই গ্রামের নাম কাশ্যেন। সারা দিন ধরেই এখানে মেঘেরা খেলা করে। আর তা উপভোগ করতে হলে আসতেই হবে পাহাড়ি এই অচেনা গ্রামে।

যেখানে খুব বেশি থাকার জায়গা নেই। হাতে গোনা কয়েকটি হোমস্টে হয়েছে। তার মধ্যে নজর কেড়েছে ট্রাভেলাইটস হিল স্টে। যেখানে বসে আপনি মেঘের সাথে সময় কাটাতে পারবেন।

হাওয়া বদল বলুন কিংবা গরম থেকে স্বস্তি পেতে, দু’দিনের জন্য নিজের রাজ্যেই ঠান্ডা উপভোগ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং সহ এমন অনেক জায়গা আছে। কিন্তু সেখানে পর্যটকের আনাগোনা এত বেশি যে নিরিবিলিতে থাকা আর হয়ে ওঠে না। সেদিক থেকে কাশ্যেন কিন্তু একেবারে আদর্শ জায়গা। বন্ধু সোহমের মুখ থেকে শোনার পরই এখানে আসার ইচ্ছা জেগেছিল। অবশেষে সেই আশা পূরণ হল।

হাওড়া থেকে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটের হাওড়া-এনজেপি বন্দেভারত ধরলাম। সাড়ে সাত ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। দুপুর ২টো ৪০ মিনিট নাগাদ আমরা রওনা দিলাম কাশ্যেনের উদ্দেশ্যে।

এনজেপি থেকে বেশ কয়েকটি রুটে কাশ্যেন পৌঁছনো যায়। আমাদের গাড়ি এনজেপি থেকে রওনা হল। শিলিগুড়ির যানজট ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ি ছুটতে থাকল গজলডোবার দিকে। গজলডোবা হয়ে যাওয়ার এই রাস্তাটির প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যি অসধারণ। আমরা সেই রাস্তাই ধরলাম। নিম সেতু, তিস্তা ব্রিজ, করলা সেতু হয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম গজলডোবা। এখানেই রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ। আমাদের গাড়ি এসে সেখানে দাঁড়াল।যেখানে একটা বাজার আছে। অর্পিতা, সায়ন্তনীরা এই বাজার থেকে কিছু সবজি কিনে নিলেন। কারণ ওদের যে হোমস্টে আছে কাশ্যেন গ্রামে সেখানে তেমন কোনও বাজার নেই। তাই ওরা বরাবরই এখান থেকে সবজি বাজার করে থাকেন।

এই বাজার থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটতে থাকল ওদলাবাড়ি চা বাগানের দিকে। পথেই চোখে পড়ল সেই পরিচিত দৃশ্য। বেশ কয়েকজন মহিলা চা বাগানে চা পাতা তুলছেন। সেই পথ ধরে একটু এগিয়েই পড়ে ক্রান্তি রোড, দক্ষিণ ওদলাবাড়ি কালীবাড়ি বাজার। গাড়ি আবার সেখানে দাঁড়াল। এখান থেকে বোরোলি মাছ কিনে আমাদের গাড়ি ফের ছুটতে থাকল সামনের দিকে। গাড়ি যত এগোচ্ছে ততই যেন রাস্তার শোভা বাড়ছে। লোকবসতি কেমন যেন হালকা হয়ে আসছে। কিছু দূরে গিয়েই একটি খাওয়ার দোকানের সামনে দাঁড়াল আমাদের গাড়ি। সেখান থেকে চা আর ফিস ফিঙ্গার খেয়ে আমরা এবার সোজা রওনা হলাম, কাশ্যেনের উদ্দেশ্যে। বন্ধু সোহম জানিয়ে দিল, এবার আমরা আর কোথাও দাঁড়াব না। কারণ এই রাস্তা অনেকটা। সময় লাগবে। গাড়ি এবার ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে ছুটতে থাকল। দু’পাশের অপূর্ব নৈস্বর্গিক দৃশ্য তারিয়ে উপভোগ করছিলাম। সূর্য ক্রমেই অস্তাচলে যেতে বসেছে। দিনের আলো কমে আসছে। হালকা ঠান্ডা লাগছে। শীতের আমেজ যেন ক্রমেই ছেয়ে ফেলছে। বাগারাকোট হয়ে আমরা যখন উপর দিকে উঠছি চোখে পড়ল এক বিশালাকার ব্রিজ। পাহাড়ি রাস্তায় এমন সুন্দর ব্রিজ আমি এর আগে কোথাও দেখিনি। হয়তো অন্য কোন রাজ্যে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে এমন সুন্দর ব্রিজ  দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল।

স্থানীয় একজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম- এটি শেল্রুটি ব্রিজ। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি লুপ ব্রিজ নামেই অধিক পরিচিত। খুবই অল্প সময় দাঁড়ালাম। উপর থেকে এই লুপ ব্রিজের বিউটি অসাধারণ। এরপর গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে কাশ্যেনের দিকে ছুটতে থাকল।

রাত সাড়ে আটটার কাছাকাছি আমরা পৌঁছে গেলাম কাশ্যেনে আমাদের মূল গন্তব্য- ট্রাভেলাইটস হিল স্টে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল টারজান। লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল আমার দিকে। এত মানুষ দেখে ওর তখন কত আনন্দ!

আমরা ঘরে লাগেজ রেখে একটু বাইরে এলাম। রাতের অন্ধকার আর মেঘের আনাগোনায় কাশ্যেনের শোভা যেন কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। দূরের পাহাড়ের গায়ে জোনাকির মতো আলো মিট্মিট করে জ্বলছে। সাথে মেঘ যেন চারিদিকে ছেয়ে ফেলেছে। বাইরে ঠান্ডাও বেশ লাগছে। জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে নিলাম।

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে চার হাজার ফুট উঁচুতে এই পাহাড়ি গ্রাম কাশ্যেন। আর সেখানেই ট্রাভেলাইটস হিল স্টে।  পিছনে পাহাড়ি জঙ্গলের কোলে ছবির মতো সুন্দর এই হোমস্টে যেন ভ্রমণপ্রেমীদের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছে।

সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হল- এখানকার আতিথেয়তা। আপনাকে বুঝতেই দেবে না, আপনি কোথাও ঘুরতে এসেছেন। সব সময় মনে হবে, আপনি নিজের বাড়িতে আছেন। রাতে রুটি মাংস খেয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। হোম স্টে-র পিছনে পাহাড়ি জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসছিল নানা ধরনের পাখির ডাক। কখনও মেঘে ঢাকা পড়ছে আবার কখন রো উঁকি মারছে। আর একটা শীতের আমেজ।

ঘড়ির কাটায় সকাল আটটা। আমরা আশপাশের গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ি জঙ্গলের পথ চিড়ে আঁকাবাকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কাশ্যেনের পাশের গ্রাম স্যামডং। প্রকৃতি যে কত সুন্দর হতে পারে তা এই গ্রাম না দেখলে বোঝা যেত না। অনেকটা পথ হাঁটলাম। গ্রামের মানুষের সাথে কথাও বললাম। অবশেষে এই গ্রাম থেকে বেরিয়ে ফিরে এলাম কাশ্যেনে ট্রাভেলাইটস হিল স্টে-তে।

সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি নিয়ে আশপাশের কয়েকটা জায়গা দেখতে। আবহাওয়া খুব ভালো ছিল ন। মেঘ আর বৃষ্টির খেলা চলছিল। তারই মধ্যে আমরা পাহাড়ি পথে পৌঁছে গেলাম ডুকা ফলস। বর্ষার সময় এই ঝর্নার শোভাই বদলে যায়। আমরা যখন এখানে এলাম , ঝর্ণার জলের ধারা খুবই সরু হয়ে পড়ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ডুকা ভ্যালিতে। এই স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব। উলটো দিকেই রয়েছে সিকিম। দূর থেকে সেই শোভা মন কেড়ে নেয়।

বৃষ্টি পড়ছিল। ফলে এখান থেকে বেরিয়ে সিলারি গাও-এর পথ ধরে মিলন ভিউ পয়েন্টে পৌঁছলাম। কিন্তু বৃষ্টির জোর বেশি থাকায় এখান থেকে আর কিছুই চোখে পড়েনি। তবে স্থানীয় লোকজন জানালেন, ফেব্রুয়ারি, মার্চ অথবা অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে এলে এই জায়গা থেকে উল্টোদিকে নাথুলা বর্ডার দেখা যায়। এখান থেকে আমরা সোজা ফিরে আসি আমাদের হোমস্টে-তে।

বিকেলের পর থেকে আবহাওয়া বদলাতে শুরু করে। অন্ধকার নেমে আসার সাথেই সাথেই চারিদিকে ঠান্ডা জাঁকিয়ে পড়তে থাকে।  স্থানীয় যুবক প্রণয় আমাদের জন্য ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করে। সেখানে বরোলি মাছ ভাজা আর চিকেন পকোড়া সঙ্গে স্পেশাল চায়ের ব্যবস্থা করা হয়। মেঘের আনাগোনা, একটা শীতের আমেজ এই ক্যাম্প ফায়ারকে জমিয়ে দিয়েছিল।

রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে বন্ধু সোহমের সাথে নৈশ ভ্রমণে বেরোলাম। এই গ্রামটিতে বেশ কয়েকটি চার্চ আছে। ট্রাভেলাইটস হিল স্টে-র বা-দিকের রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলে খ্রিস্টানদের কবরখানা পড়ে। রাতের অন্ধকারে সেদিকে খুব একটা কেউ যায় না। তবু আমরা হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে চলে গিয়েছিলাম। গা-টা ছমছম করছিল ঠিকই, তবে একটা রোমাঞ্চ জাগছিল মনে। ঘুরতে এসে কি ঘরে নিজেকে আটকে রাখা যায়? তা কোনওদিনই হয়নি। এরপর আমরা উল্টোদিকের রাস্তা ধরে জঙ্গলের দিকটায় এগোতে থাকলাম। শুনশান রাস্তা। জঙ্গলের ভিতর থেকে শি-শি আওয়াজ ভেসে আসছে। সোহম আর আমি গল্প করতে করতে কখন যে এক কিলোমিটার রাস্তা চলে এসেছি বুঝতে পারিনি। এরপর সোহম বলে উঠল- আর বেশি দূর যাওয়া ঠিক হবে না। ফিরে যাই। আমরা ফিরে আসি।

পরদিন ভোরে ফের পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে যায়। সকালের খাবার খেয়ে ফের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। মোট ৩৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করি। এদিন আমরা গিয়েছিলাম সিকিমের রংপো-র দিকে। এখান থেকে রংপো খুব বেশি দূরে নয়। ভারতীয় রেলের কাজ চলছে রংপো পর্যন্ত। রেল চালু হয়ে গেলে এখানকার গুরুত্ব আরও বাড়বে। পর্যটকের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। এদিন আমরা বেশ কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট দেখলাম। যাওয়ার পথে দেব্দারুর জঙ্গের পথ চিড়ে চলে যাওয়া পথের শোভা যেন কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। রাস্তার ধারে রঙ-বেরঙের ফুল আর অর্কিড প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন ছবির মতো এঁকে দিয়েছে। মনসুঙ ভিউ পয়েন্ট, হিমালি ভিউ পয়েন্ট সত্যি দেখার মতো। উপর থেকে নীচ দিয়ে বয়ে চলা নদী , তা সে কখন তিস্তা আবার কখন তা ঋষিখোলা নদী নামে বয়ে গিয়েছে। একেবারে নীচে সিকিমের দিকে রংপোখোলা নদীর ধার ঘেঁষে রানিবন জঙ্গল চলে গিয়েছে। আর সেখানেই দেখলাম এক পূর্ণ বয়স্ক ময়ূর। আমাদের ভ্রমণ যেন পরিপূর্ণতা লাভ করল। ফিরে এলাম হোম স্টে-তে।

পরদিন সকাল আটটায় আমাদের বেরোনোর তারা ছিল। কারণ, দুপুরের বন্দেভারত ধরতে হবে। সকাল হতেই বন্ধু টারজান ঘুরঘুর করছিল। আসলে এই কদিনে টারজান খুবই কাছের হয়ে গিয়েছিল। আজ ওর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার দিন। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিল। পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্ণা, নানা রঙের ফুল, অর্কিড আর পাখির কলতানে দু’দিন বেশ কাটল। গাড়ি এসে দাঁড়াল। উঠে পড়লাম। বিদায় কাশ্যেন। ট্রাভেলাইটস হিল স্টে। পিছনে পড়ে রইল সুন্দর স্মৃতি। গাড়ি যত দূরে যেতে থাকল সাদা মেঘের ভেলায় ততই বন্ধু টারজানের সাথে টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলি কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকল। মনের ভিতরে অচেনা কাশ্যেন ভ্রমণের নির্যাস নিয়ে ফিরলাম কলকাতায়।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: sangbadprabhakartimes