Friday, 14 Sep, 9.12 am আজকাল.in

কলকাতা
‌'‌কথামৃত' ছাপিয়ে পঞ্জিকার বিক্রি

তাপস গঙ্গোপাধ্যায়-শারদীয়া বা পুজো সংখ্যার নভেম্বরের শেষাশেষি পরের বছরের কাজ শুরু হয়ে যায়, পঞ্জিকাও বাস্তবিকই তাই।
বাঙালির আদি পঞ্জিকা ছিল '‌নবদ্বীপ পঞ্জিকা'‌। ঐতিহাসিকদের অনুমান তার প্রতিষ্ঠাতা সম্ভবত ছিলেন স্মার্ত রঘুনন্দন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (‌১৭১০-‌১৭৮২)‌ আমলে রামরুদ্র বিদ্যানিধি নতুন করে গণনা আরম্ভ করেন। আগে তালপাতার পুঁথিতে এসব লেখা হত। প্রথম ছাপার অক্ষরে শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে ১৮৬৯ সালে।
এই মুহূর্তে বিভিন্ন পঞ্জিকার যাঁরা স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদকদের বক্তব্য, বছরভর পণ্ডিতমণ্ডলী পুনর্মার্জন ও সংশোধন করে চলেন। ফাঁকি দিলে নিজেদেরই ফাঁকে পড়তে হয়। পুরুতমশাইরা মুখ ঘুরিয়ে নেবেন, সেই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ গেরস্থ। ৫-‌৬টা পঞ্জিকার মোট বিক্রি ৫০ লাখের ওপর। এক শ্রীম-‌র '‌কথামৃত'‌ ছাড়া আর কোনও বাংলা বই ‌এর ধারেকাছে কোনওদিন পৌঁছয়নি। শুধু বেণীমাধব শীলের যে বিভিন্ন সাইজের, পৃষ্ঠার, দামের সাত-‌সাতটা সংস্করণ ফি বছর বেরোয়, তার সম্মিলিত বিক্রি বছরে '‌বারো লাখ'‌। এই তথ্য দিয়েছেন তাঁরই বড় ছেলে মোহনচাঁদ শীল। ৬৬ বছর বয়সি মোহনচাঁদ বললেন, আমাদের ৭টি বিভিন্ন পঞ্জিকা আছে। সব ক'‌টির নামের শুরুতে রয়েছে বেণীমাধব শীল, তার পর ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা, সচিত্র পঞ্জিকা, ফুল পঞ্জিকা, হাফ পঞ্জিকা, পূর্ণাঙ্গ পঞ্জিকা, গার্হস্থ্য পঞ্জিকা ও পকেট পঞ্জিকা। যেটির বিক্রি ওই বারো লাখের প্রায় বারোআনা, তার নাম আমাকে বললেও, অনুরোধ করেন, ওটা আর লিখবেন না।
আজ থেকে ১৬০ বছর আগে হাওড়ার মাকড়দা থেকে মোহনচাঁদের প্র-‌পিতামহ দ্বারিকনাথ শীল চাকরির খোঁজে এসেছিলেন কলকাতায়। সেদিন দ্বারিকনাথ আশ্রয় যেখানে পেয়েছিলেন, উত্তর কলকাতার সেই রাস্তার নাম আজ জয় মিত্র স্ট্রিট। চাকরি পান পোস্তায় পুরনো ট্যাঁকশালে। পরে ছেলে পূর্ণচন্দ্রও কাজ পান এই ট্যাঁকশালে। এই পূর্ণচন্দ্রই প্রথমবার বার করেন ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা। কিন্তু উনি ছিলেন সরকারি চাকুরে। তাই পঞ্জিকার ব্যবসা চালাতেন মা মনমোহিনী দেবীর নামে। পূর্ণচন্দ্রের ছেলে বেণীমাধব আর চাকরি নয়, আজীবন ব্যবসা করেন পঞ্জিকা নিয়ে। বেণীমাধব প্রয়াত হন ১৯৮৯ সালে। এখন ওই সব পঞ্জিকার মালিক তাঁর বড় ছেলে মোহনচাঁদ এবং ছোট অভিজিত্‍। এঁদের মেজ ভাই শশাঙ্ক শীল ১৯৯৯ সালে মারা যান। শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের প্রায় গা-‌লাগোয়া অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটে পাঁচতলা বাড়িটি এঁদের অফিস-‌কাম-‌বাড়ি। মোহনচাঁদের একটিই মেয়ে, পৌলোমী শীল ভট্টাচার্য। অভিজিতের দুই ছেলে- অভিদেব ও অভিরণ। তিন ভাইবোন এখন বাবা-‌জ্যাঠার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। সেদিন আলোচনার মধ্যে মোহনচাঁদের একটি কথা কানে লেগে যায়- পঞ্জিকার ব্যবসায় আপনি মামলা এড়াতে পারবেন না।
এটা যে কত সত্যি, তার প্রমাণ আধুনিক বাঙালি সমাজে যে পঞ্জিকাটি সবচেয়ে পুরনো, যার বয়স আজ ১৪৯ বছর, আগামী বছরে দেড়শো হবে, সেই গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকাটিকে নিয়ে কম জলঘোলা হয়েছে?‌ ১৮৬১ সালে দুর্গাচরণ গুপ্ত এই পঞ্জিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই প্রথম বাঙালি পুঁথি ছেড়ে ছাপার অক্ষরে পঞ্জিকা পেল। পরে তাঁর ছেলে জগজ্যোতি পান মালিকানা। শুরু হয়ে যায় মামলা। সেই মামলার নিষ্পত্তি যখন হাইকোর্টে হল, তখন আদালতই জগজ্যোতির বংশধরদের পাওনাগণ্ডা মেটাতে পাম অ্যাভিনিউয়ের অজয় বসুকে বিক্রির আদেশ দেন। বর্তমানে অজয়বাবুর ছোট মেয়ে মন্দিরাদেবীর ছেলে অরিজিত্‍ রায়চৌধুরি এই পঞ্জিকার স্বত্বাধিকারী। ১৪২৫ মানে ২০১৮-‌এর সংস্করণ যে ছাপা হয়েছিল, তা আমি নিজে দেখেছি, ছবিও নিয়েছি। কিন্তু যে পঞ্জিকাটি সাম্প্রতিককালে বেণীমাধবের সঙ্গে বিক্রির সংখ্যায় টক্কর দিচ্ছিল, সেই গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা না দশকর্মা ভাণ্ডার, না বই-‌এর দোকান- অধিকাংশই পায়নি। গড়িয়াহাট বাজারের শ্রীদুর্গা দশকর্মা ভাণ্ডারের সুকুমার মণ্ডল বললেন, এবার বেণীমাধব বেচেছি দেড়শোটির মতো, তার পর মদন গুপ্ত, পিএম বাকচি ৩/‌৪ কপি, আর '‌গুপ্তপ্রেস বেরোয়নি'‌। এই কথা শ্রীশ্রীসারদাদেবী দশকর্মা ভাণ্ডারের দুই কর্মচারী সুশান্ত মণ্ডল ও হরেকৃষ্ণ জানার। ওঁরা এ বছর বেণীমাধব বেচেছেন ৩০০ কপি, মদন গুপ্ত ১০০, পি এম বাকচি ৩০টা। আর গুপ্তপ্রেশ ওঁরা পাননি। কালীঘাটে কালীমন্দিরের সামনের রাস্তা, কালী টেম্পল রোডের বাঁ-‌ধারে লাইন দিয়ে দশকর্মা ভাণ্ডার। লোকনাথ ভাণ্ডারের মালিক রবীন বিশ্বাস। পরিষ্কার নিজের ভাষায় বললেন, '‌বেণীমাধব বেচেছি ১২ ডজন, মদন ৪ ডজন, পিএম বাগচি ২ ডজন, গুপ্তপ্রেস এবার বেরোয়নি।'‌
কেন বেরোয়নি জানতে গুপ্তপ্রেশের দক্ষিণ কলকাতার অফিস ৩ অপূর্ব মিটার রোডের অফিস ‌ইন‌চার্জ সোমনাথ মল্লিকের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি চলতি বছরের পঞ্জিকা যে বেরিয়েছে, তার একটি কপি দেখালেন, ছবিও তুলতে দিলেন। বললেন, বিজ্ঞাপনদাতারা তাঁদের কপি পেয়েছেন। জানতে চাইলাম, '‌আপনাদের যে লাখ লাখ ক্রেতা, তাঁরা পেয়েছেন?'‌ চুপ করে রইলেন। মনে হল, আবার একটা মামলা কী তবে.‌.‌.‌?‌ এ প্রশ্নের জবাব দেবেন বর্তমান স্বত্বাধিকারী তাঁদের গুণগ্রাহী ক্রেতাদের কাছে।
গুপ্তপ্রেসের পর দ্বিতীয় প্রাচীনতমটি হল বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জ্যোতির্বিদ মাধবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৮৯০ সালে পঞ্জিকাটি বাজারে আসে, গুপ্তপ্রেসের ২১ বছর পর। সব বড় বড় বাংলা কাগজ এই পঞ্জিকাটির দিনক্ষণ মেনে চলে। দেশের নামী জ্যোতির্বিদ ও পণ্ডিতরা এর সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু দোকানিদের কাছে এর কদর যে কম, তার কারণ কোনও দোকানি এর বিক্রির সংখ্যা বলেননি। বয়সে ও বিক্রির সংখ্যায় তৃতীয় স্থানে আছে পিএম বাকচি। এঁরা বাগচী লেখেন না। ১০৮ বছর আগে কিশোরীমোহন বাকচি এই পঞ্জিকা বাজারে আনেন। এখন দেখভাল করছেন ওঁরই বংশধর জয়ন্ত বাকচি। বয়সে সম্ভবত নবীনতম মদন গুপ্ত। এটির বর্তমান মালিক কেএম বাজাজ এবং মোহনলাল দে। তবে মামলা থেকে রেহাই পাননি পঞ্জিকার প্রতিষ্ঠাতা মদন গুপ্ত। অভিযোগ, তিনি বেণীমাধব শীলের পরিবর্তে বেণীমাধব ভট্টাচার্যের নামে পঞ্জিকাটি প্রকাশ করেন। সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এই সেদিন, ২০১১-‌১২ সালে।
সে যাকগে, মূলকথা পঞ্জিকা ছাড়া বাঙালির জীবন অচল। সাধভক্ষণ, অন্নপ্রাশন, পৈতে, বিয়ে, মুখাগ্নি, শ্রাদ্ধ- সবেতেই চাই পঞ্জিকা। বেণীমাধব ছাড়া আর কোনও পঞ্জিকায় দামের উল্লেখ নেই। সে চারশো-‌পাঁচশো পাতার হলেও। কেন?‌ এর উত্তর, দোকানদারদের ইচ্ছেমতো দামে বেচতে দেওয়ার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য।
পণ্ডিত সবুজ ঠাকুর চক্রবর্তী বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তই অনুসরণ করেন। বেলুড়মঠ থেকে ৩ বছরের '‌পণ্ডিতি'‌ কোর্স সম্পূর্ণ করে পণ্ডিত হয়েছেন। ভারত সরকারের পঞ্জিকা সংশোধন কমিটির সুপারিশ তারা মেনে চলে। সেই সঙ্গে দেখালেন একটি বহু প্রচারিত পঞ্জিকা '‌টিকটিকি পতনের ফলাফল'‌ সম্পর্কে প্রদত্ত বিধান। দেখলাম ১৬টি ফল পাওয়া যায়। যেমন মাথায় পড়লে রাজ্যলাভ, কানে পড়লে অলঙ্কারপ্রাপ্তি, নাকে পড়লে মিলবে সুগন্ধি, পিঠে পড়লে ভূ-‌সম্পত্তি ইত্যাদি।‌‌

Dailyhunt
Disclaimer: This story is auto-aggregated by a computer program and has not been created or edited by Dailyhunt. Publisher: Aajkaal
Top