Saturday, 12 May, 4.25 am আজকাল.in

মাতৃ দিবস ২০১৮
সত্যজিত্‍কে বলতাম, করবেন না স্যর, বদনাম হয়ে যাবে!

সপ্তাহের সাক্ষাত্‍কার: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

('মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি' বড়পর্দায়। কিন্তু অস্কারজয়ী পরিচালক তাঁর কোনও গল্প নিয়ে ছবি করতে চাইলে কী বলতেন? প্রশ্নের জবাব পেলেন অনিন্দ্য জানা)

কখনও ভেবেছিলেন '‌মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি' সিনেমা হবে?‌
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়:‌ স্বপ্নেও ভাবিনি!‌ উপন্যাসটা নিয়ে প্রথম‌দিকে অভিজ্ঞতাটা তো খারাপ। কারণ, ওটা সামান্যই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তখনকার পাঠকরা উপন্যাসটা নিতে পারেননি। এখন সমাদর পাচ্ছে। উপন্যাসটা নিয়ে দূরদর্শনে একটা সিরিয়াল হয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু ভাল হয়নি। ভাঁড়ামো করে নষ্ট করে ফেলেছিল। কারও ভাল লাগেনি।
এটা আপনার প্রথম কিশোর উপন্যাস। কোন প্রেক্ষিতে উপন্যাসটা লিখেছিলেন সেটা মনে আছে?‌
শীর্ষেন্দু:‌ বাচ্চাদের লেখা তো লিখতাম না! ১৯৭৬/‌৭৭ সাল নাগাদ নীরেন'‌দা (‌নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)‌ আনন্দমেলায় একটা গল্প লেখান আমাকে দিয়ে। সেটা ওঁর ভাল লেগেছিল। তখন উনিই আমায় একটা ধারাবাহিক লিখতে বলেন। ১২ সংখ্যায়। লিখতে বসে বিশেষ কিছু চিন্তাভাবনাও করিনি। কিছুটা আমার ছোটবেলার স্মৃতি, নস্ট্যালজিয়া থেকে উপন্যাসটা লিখেছিলাম। গ্রামের পটভূমিকায় কিছু ভূত-টূত থাকে। সেখানেই অদ্ভুত চরিত্র বেশি মানায়। শহরের ছেলেপুলেদের জন্য বেশি ভুতুড়ে গল্প লেখা যায় না। তাই আমি একটু চিন্তায় পড়েছিলাম। নীরেন'‌দা বললেন, বেশি চিন্তাভাবনা করতে হবে না। তুই লেখ!‌ তো আমি আলাদা আলাদা চ্যাপ্টারে লিখে ফেললাম।
উপন্যাসে কিছু লাইন ছিল, '‌বল করার সময় সরোজের হাতটা একটা ঘূর্ণমান সিলিং ফ্যানের চক্রের মতো দেখায়'‌। বা, 'বিশাল ছক্কাটা ইস্কুলের দেওয়ালে লেগে খানিক চুনবালি খসিয়ে জায়গাটায় একটা আফ্রিকার ম্যাপ তৈরি করে দিল'। এই চিত্রকল্প সিনেমায় সম্ভব?‌
শীর্ষেন্দু:‌ লাইনগুলো এখন আর আমার মনে নেই। কিন্তু সিনেমা আর বইয়ের তফাত আকাশপাতাল। দুটোকে কিছুতেই সমান ভালভাবে আনা যাবে না। সিনেমায় কোনও কল্পনা থাকে না। ফলে একটা গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। সত্যজিত্‍ রায় যেমন গোটা '‌পথের পাঁচালী'‌ নিয়ে সিনেমা করতে যাননি। বড়জোর এক-তৃতীয়াংশ নিয়েছিলেন। বাকিটা বর্জন করেছিলেন। আমার ক্ষেত্রে সেই গ্রহণ-বর্জনের অনুমতিটা আমি সিনেমাওয়ালাদের দিয়ে দিই।
যতদূর মনে পড়ছে, '‌পাতালঘর'‌ উপন্যাস থেকে সিনেমা হওয়ার পর কিন্তু আপনার খুব একটা পছন্দ হয়নি।
শীর্ষেন্দু:‌ আমার পছন্দ না-হলেও অনেকেরই কিন্তু ভাল লেগেছিল। আসলে আমি তো গল্পটার লেখক। আমি আমার সেই দুর্বলতাবশত সিনেমাটা দেখেছিলাম। তাই আমার খারাপ লাগে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের ভাল লেগেছিল দেখে ভাল লেগেছে। আমার '‌ছায়াময়'‌ উপন্যাসটা নিয়ে হরনাথ চক্রবর্তী ছবি করেছিল। সেটা খুব ভাল হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, ছবিটা চলেনি। রিলিজটা ঠিকমতো হয়নি। পাবলিসিটিও হয়নি।
'‌দূরবীন'‌ তো সিরিয়াল হয়েছিল। কেমন হয়েছিল?‌
শীর্ষেন্দু:‌ খুব খারাপ হয়নি কিন্তু। বছরকুড়ি আগে হয়েছিল। পীযূষ গাঙ্গুলি ধ্রুব চৌধুরীর রোলটা করেছিল। খারাপ করেনি। এমনিতে আমার গল্প নিয়ে সিরিয়াল বা টেলিফিল্ম কিন্তু প্রচুর হয়েছে। '‌চোখ'‌ যেমন টেলিফিল্ম হয়েছে। '‌ঝিলের ধারে বাড়ি'‌ও হয়েছে।
কী মনে হয়, '‌মানবজমিন'‌, '‌যাও পাখি'‌ বা '‌গোঁসাইবাগানের ভূত'‌ সিনেমা হতে পারে?‌
শীর্ষেন্দু:‌ মুশকিল!‌ ওগুলো বড় উপন্যাস। ঘনবদ্ধ গল্প তো নয়। অনেক ছড়ানো। প্রচুর চরিত্র। দু'‌ঘন্টার মধ্যে অত ছড়ানো গল্প সিনেমা করা মুশকিল। তবে সিরিয়াল করতে চেয়েছে অনেকে। '‌মানবজমিন'‌ তো বাংলাদেশে সিরিয়াল হয়েওছে। '‌গোঁসাইবাগানের ভূত'‌ নিয়েও সিনেমা হয়েছে তো। নীতীশ রায় করেছিলেন। তবে খুব ভাল করতে পারেননি। থিমটা মিস্‌ করেছেন। মজার জায়গাটা মিস্‌ করে গিয়েছেন।
'‌গোয়েন্দা শবর'‌ অবশ্য আপনার ভাল লেগেছে। ইন ফ্যাক্ট, শবর পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল, সিনেমা বানানো হবে ভেবেই লিখেছিলেন। চিত্রনাট্যের মতো। সংলাপপ্রধান গল্প।
শীর্ষেন্দু:‌ আরে আমি তো ফাঁকি মারার জন্য ডায়ালগপ্রধান গল্প লিখি! ‌ সংলাপনির্ভর এবং স্ট্রিমলাইন্‌ড। এখন সেটাই একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে। (‌হাসতে হাসতে)‌ এই একটা ব্যাপারে আমি কিন্তু বাংলা সাহিত্যে পাইওনিয়ার। '‌শবর'‌ আমার খারাপ লাগেনি। প্রথমে ছবিটা দেখতে যাইনি। আমি এমনিতে একদমই সিনেমা দেখি না। ভাল লাগে না। ধৈর্যের অভাব আছে বোধহয়। ছেলেমেয়েরা এসে হয়ত বলল কোনও সিনেমার কথা। তখন দেখলাম। যেমন '‌জগ্গা জাসুস'‌। সেদিন টিভি-তে দেখলাম অর্ধেকটা। প্রথমে খারাপ লাগছিল না। কিন্তু পরে গিয়ে মনে হল একটু গুলিয়ে গেছে। '‌শবর'‌ দেখার জন্য অরিন্দম শীল ফিঙের মতো পিছনে লেগেছিল। দেখাবেই!‌ দেখে ভালই লেগেছিল। গল্প থেকে সরে যায়নি। আর '‌শবর'‌ কিন্তু গল্প হিসেবে অত জনপ্রিয়তা পায়নি। সিনেমা হওয়ার পর বিক্রি হল প্রবল!
'‌বক্সার রতন'‌ সিনেমা হতে পারে না?‌
শীর্ষেন্দু:‌ হতে পারে। বোধহয় ওটা অলরেডি বিক্রিও হয়ে আছে। তবে ওটা আগেই গ্রাফিক নভেল হয়েছে। সেখানে অ্যামেচার বক্সারকে খালি গায়ে, হেডগিয়ার ছাড়া আঁকা হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, সেটা ভুল। তারপরে আর্টিস্ট ছেলেটি বই-টই ঘেঁটে জানাল, অ্যামেচারদের জন্য ওই বাধ্যবাধকতাটা উঠে গেছে এখন। তবুও বলে দিয়েছি, সিনেমা করা হলে বক্সিংয়ের টেকনিক্যাল ব্যাপারে যেন গোলমাল না-থাকে।
'‌মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি'‌ কি বাস্তবে থাকা সম্ভব?‌
শীর্ষেন্দু:‌ ছিল তো!‌ আমাদের গ্রামের বাড়িটাই ছিল। যৌথ পরিবার। একজন রোজগার করে। পাঁচজন খায়। বাতিকগ্রস্ত সব লোক। সত্যিই মজার মজার সব ব্যাপার থাকত। সেটা আমার নিজের চোখে দেখা বলে লিখতে সুবিধেও হয়েছিল।
সত্যজিত্‍ রায় আপনার কোনও গল্প নিয়ে সিনেমা করতে চাইলে কোনটার কথা বলতেন?‌
শীর্ষেন্দু:‌ উনি তো '‌ঘুণপোকা'‌ নিয়ে একটা চিন্তাভাবনা করেছিলেন। ওঁর ম্যানেজার আমাকে বলেছিলেন। আমার সঙ্গে সত্যজিত্‍বাবুর আলাপও ছিল। আমার গল্প খুব পছন্দও করতেন। কিন্তু উনি সিনেমা করতে চাইলে কোন গল্পটার কথা বলতাম, এটা বলা কঠিন। আমার কোনও গল্পই কীভাবে সিনেমা হবে, সেটা ভেবে পাই না!‌ আমি তো ধরে নিয়েছিলাম, আমার কোনও গল্প নিয়েই কখনও কোনও সিনেমা হবে না। সত্যজিত্‍বাবু আমার কোনও গল্প নিয়ে কোনও ছবি করতে চাইলে কী বলতাম?‌ নিরুত্‍সাহিতই করতাম। বলতাম, করবেন না স্যার!‌ আপনার বদনাম হয়ে যাবে (হাসি)!‌

Dailyhunt
Disclaimer: This story is auto-aggregated by a computer program and has not been created or edited by Dailyhunt. Publisher: Aajkaal
Top