Diabetes Temple In India: হাতে একমুঠো চিনি। মনে একটাই প্রার্থনা—ব্লাড সুগার যেন নিয়ন্ত্রণে আসে। কেউ এসেছেন বহু বছরের ডায়াবিটিস নিয়ে, কেউ আবার পরিবারের অসুস্থ সদস্যের জন্য পুজো দিতে। মন্দিরে পৌঁছে সেই চিনিই শিবের উদ্দেশে নিবেদন করেন ভক্তরা। বিশ্বাস, বিশেষ এই রীতি পালন করলে কমতে পারে শরীরের 'সুগার'!
শুনতে অবাক লাগলেও ভারতের একটি প্রাচীন শিবমন্দিরকে ঘিরে এমনই বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে বহু বছর ধরে। তামিলনাড়ুর তিরুভারুর কোইলভেন্নি গ্রামে অবস্থিত ভেন্নি করুম্বেশ্বরর মন্দির। ভক্তদের একাংশের কাছে এটি এখন 'Diabetes Temple' বা 'ডায়াবিটিস মন্দির' নামেও পরিচিত।
কিন্তু কেন শিবমন্দিরে চিনি নিবেদন করা হয়? কেনই বা ডায়াবিটিস রোগীরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন এখানে? এর নেপথ্যে রয়েছে একটি অদ্ভুত লোকবিশ্বাস, প্রাচীন ইতিহাস এবং পিঁপড়েকে ঘিরে এক রহস্যময় রীতি।
চিনি নিবেদন করলেই কমে ব্লাড সুগার?
এই মন্দিরে অধিষ্ঠিত শিবের নাম ভেন্নি করুম্বেশ্বরর। 'করুম্বু' শব্দের অর্থ আখ বা sugarcane। সেই থেকেই দেবতার নামের অর্থ দাঁড়ায় 'আখের অধীশ্বর' বা 'Lord of Sugarcane'।
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ডায়াবিটিসে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি মন্দিরে এসে ভক্তিভরে প্রার্থনা করে চিনি নিবেদন করলে তাঁর অসুখের প্রকোপ কমতে পারে। বহু ভক্ত দাবি করেন, মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর তাঁদের ব্লাড সুগারের মাত্রা কমেছে। কেউ কেউ ওষুধের প্রয়োজন কমে যাওয়ার কথাও দাবি করেছেন।
তবে এগুলি সম্পূর্ণভাবে ভক্তদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের দাবি। চিনি নিবেদন বা কোনও ধর্মীয় আচার ডায়াবিটিস সারাতে পারে—এমন কোনও স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
পিঁপড়ে চিনি খেলেই শরীর থেকে কমে 'সুগার'?
এই মন্দিরের সবচেয়ে চর্চিত রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চিনি এবং পিঁপড়ে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তরা শিবের উদ্দেশে চিনি বা চিনি-মেশানো বিশেষ নিবেদন করেন। পরে সেই চিনি মন্দির চত্বরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পিঁপড়েরা ধীরে ধীরে সেই চিনি খেয়ে নেয়।
আর এখানেই রয়েছে লোকবিশ্বাসের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ।
ভক্তদের একাংশ বিশ্বাস করেন, পিঁপড়েরা যত চিনি খায়, প্রতীকীভাবে ততই কমতে থাকে রোগীর শরীরের 'সুগার'। এই বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহু মানুষ এই রীতি পালন করে আসছেন।
কেন নাম করুম্বেশ্বরর?
মন্দিরের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন কাহিনি।
কথিত আছে, এক সময় এই অঞ্চল আখের খেতে ভরা ছিল। দুই ঋষি এই স্থানে এসে শিবের উপস্থিতি অনুভব করেন। কিন্তু এই পবিত্র স্থানের 'স্থলবৃক্ষ' বা sacred tree কী হবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়।
একজনের মতে, আখ বা করুম্বুই হওয়া উচিত পবিত্র বৃক্ষ। অন্যজনের মতে, ভেন্নি বা নন্দিয়াবর্তম গাছের সেই মর্যাদা পাওয়া উচিত।
লোককথা অনুযায়ী, তখন দৈববাণী হয়—দু'টিই এই স্থানের পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে স্বীকৃত হবে। এরপর থেকেই শিব এখানে তামিল ভাষায় 'করুম্বেশ্বরর' এবং সংস্কৃতে 'রসপুরীশ্বরর' নামে পূজিত হন।
সাধারণ মন্দির নয়, ২৭৫টি পবিত্র শিবস্থানের অন্যতম
ভেন্নি করুম্বেশ্বরর মন্দিরের গুরুত্ব শুধু ডায়াবিটিস ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শৈব ধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান।
মন্দিরটি ২৭৫টি Paadal Petra Sthalams-এর অন্যতম। অর্থাৎ, যে শিবমন্দিরগুলির মাহাত্ম্য প্রাচীন তামিল শৈব ভক্তিগীতি 'তেভারম'-এ গাওয়া হয়েছে, এটি তারই একটি।
শৈব নায়নার সাধক তিরুঞ্জানসম্বন্দর এবং তিরুনাভুক্কারাসার তাঁদের স্তোত্রে এই তীর্থস্থানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন বলে জানা যায়।
মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব এখানে ভেন্নি করুম্বেশ্বরর নামে পূজিত হন। দেবী পার্বতী পূজিত হন সৌন্দরনায়াগী নামে।
মন্দির কত পুরনো?
বিভিন্ন রিপোর্টে মন্দিরটিকে প্রায় ১৩০০ বছরের প্রাচীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ ভারতের শৈব তীর্থযাত্রায় এই মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে 'Diabetes Temple' হিসেবে মন্দিরটির পরিচিতি আরও বেড়েছে। বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্টে বহু মানুষ দাবি করেছেন, এখানে প্রার্থনার পর তাঁদের ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
আর সেই দাবি ও বিশ্বাসের টানেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডায়াবিটিস আক্রান্ত মানুষ এই মন্দিরে আসেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বাস যেখানে আশার আর এক নাম
একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস। ভেন্নি করুম্বেশ্বরর মন্দিরে এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট সীমারেখা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ডায়াবিটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণই রোগ সামলানোর স্বীকৃত পথ। কোনও ধর্মীয় আচারকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তবু মানুষের জীবনে বিশ্বাসের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। কারও কাছে এই মন্দির একটি প্রাচীন তীর্থস্থান, কারও কাছে মানসিক শক্তির উৎস, আবার কারও কাছে শেষ আশ্রয়।
আর সম্ভবত সেই কারণেই আজও বহু মানুষ হাতে একমুঠো চিনি নিয়ে পৌঁছে যান করুম্বেশ্বররের দরবারে—একটাই প্রার্থনা নিয়ে, জীবন যেন আরও একটু সহজ হয়।
ডায়াবিটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ; মন্দিরে পুজো বা চিনি নিবেদন করলে রোগ সেরে যায়—এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে এই মন্দিরকে ঘিরে ভক্তদের বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দাবি বহুদিনের।
Author : পল্লবী দে

