সীমান্ত নিয়ে সংঘাতে ইতি টানতে বড় পদক্ষেপ ভারত এবং মায়ানমারের। যৌথ সীমান্তের যে অংশ এখনও পর্যন্ত নির্ধারণের বাইরে রয়েছে, তার সুরাহায় পরস্পরের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের আলোচনা চলছে বলে জানা গেল।
পরস্পরের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের বিষয়টি নিয়ে বিচার-বিবেচনা চলছে বলে জানালেন বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
তিনি বলেন, "সীমান্তের বেশ কিছু জায়গা নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা চলছে।"
মায়ানমারের সঙ্গে ভূখণ্ড অদলবদলের বিষয়টি সামনে আসে সম্প্রতি। মণিপুর সীমান্ত বরাবর কিছু জায়গা অদলবদল নিয়ে কথা শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। সেই খবরে সিলমোহর দিলেন রণধীর। তাঁর দাবি, সীমান্তের অমীমাংসিত অঞ্চলগুলি নিয়ে সমাধান বের করতে আলোচনা চলছে।
মায়ানমারের সঙ্গে জমি অদলবদলের বিষয়টি প্রথম সামনে আনে আমেরিকার সাপ্তাহিক পত্রিকা The Diplomat. গত ১৭ জুলাই সরকারি নথিকে উদ্ধৃত করে তাদের প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, মণিপুর সীমান্তের ৬৫ এবং ৬৮ নং স্তম্ভের মধ্যবর্তী ১.৪ বর্গমাইল ভূখণ্ড বিনিময়ের প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে দিল্লি। ওই দুই স্তম্ভের মধ্যে দূরত্ব ২.৮ কিলোমিটার।
যে জায়গাটি মায়ানমারের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে পর্যালোচনা চলছে, সেটি মণিপুরের চান্দেল জেলার অন্তর্গত। মায়ানমারের কবাও উপত্যকা সংলগ্ন এলাকা। ২৬মে-র যে নথিকে উদ্ধৃত করে The Diplomat, তাতে বলা ছিল, তিন মাস অর্থাৎ অগাস্টের মধ্যেই সীমান্ত নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
ভারত এবং মায়ানমারের মধ্যে ১৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। মায়ানমারের সাগাইং এবং চিন প্রদেশে প্রবেশের আগে, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরাম হয়ে এগিয়েছে ওই সীমান্ত। ওই সীমান্ত অঞ্চল পাহাড়ি, অরণ্যে ঢাকা এবং কিছুটা অংশ খোলা। সেখানের বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় ঐতিহাসিক ভাবে সীমান্তের উভয় দিকেই বসবাস করে এসেছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তথ্য বলছে, সীমান্ত স্তম্ভগুলির মধ্যেকার ১৪৭২ কিলোমিটার অঞ্চল চিহ্নিত করা হলেও, এখনও অমীমাংসিত ১৭১ কিলোমিটার। অরুণাচলের লোহিত সেক্টর এবং মণিপুরের কাবাও উপত্যকা অমীমাংসতই রয়ে গিয়েছে।
The Diplomat জানিয়েছে, অমীমাংসিত ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি ঘটাতেই জমি বিনিময়ের দিকে এগোচ্ছে ভারত এবং মায়ানমার। বেড়া দেওয়া গেলে এতে বেআইনি অনুপ্রবেশ, উগ্রপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ঠেকানো যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
'দ্য ডিপ্লোম্যাট'-এর তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের অমীমাংসিত অংশের সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা; এর ফলে অবৈধ অভিবাসন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যাতায়াত এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ রোধে নয়াদিল্লি ওই সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।
২০২৪ সালে ভারতের তরফে গোটা মায়ানমার সীমান্তে, ১৬৪৩ কিলোমিটারেই কাঁটাতারের বেড়া বসানোর ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে যে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল, তাও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লি। ভারত-মায়ানমার সীমান্তে অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থার আওতায় সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ ভিসা ছাড়া, শুধুমাত্র বর্ডার পাস ব্যবহার করেই পরস্পরের ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারতেন।
বর্তমানে ভারত এবং মায়ানমারের মধ্যে যে সীমান্ত রয়েছে, তা ১৯৬৭ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি দ্বারা চিহ্নিত। কিন্তু কিছু অঞ্চল এখনও পর্যন্ত অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছে। ২০১৮ সালে সংসদে কেন্দ্র জানায়, ন'টি স্তম্ভ চিহ্নিত করে, সেগুলি স্থাপন করে সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজ সম্পূর্ণ হবে।
২০১৮ সালে সরকার সংসদকে জানায় যে, নয়টি সীমানা স্তম্ভ চিহ্নিত ও স্থাপন-সহ একটি দ্বিপাক্ষিক সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবশিষ্ট অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা চিহ্নিত করা হবে। তবে মোলচাম, মোরেহ্ , চোরো খুনোও সেক্টরের মতো কিছু স্পর্শকাতর এলাকা নিয়ে উদ্বেগ ছিলই। সীমান্ত স্তম্ভ ৬৪ এবং ৬৮টির মধ্যে অবস্থিত মোলচাম। মোরেহ্ অবস্থিত ৭৫ এবং ৭৯ নং স্তম্ভের মধ্যিখানে। চোরো খুনোও ৮৮ এবং ৯৫ নং স্তম্ভের মাঝে অবস্থিত। মায়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত নেই বলে গোড়া থেকে দাবি করে আসছে ভারত। তবে মাত্র ন'টি পিলারের কথাই বলা হয়।
The Diplomat জানিয়েছে, মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অউং লাইং গত মাসে দিল্লি সফরে এসেছিলেন। সেই সময়ই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় দুই পক্ষের মধ্যে। ৬৫ এবং ৬৮ নম্বর সীমান্ত স্তম্ভের মধ্যবর্তী মোলচাম সেক্টরে অতিরিক্ত এবং নতুন স্তম্ভ স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে কথা হয়।পাশাপাশি, ওই এলাকায় সীমান্তরেখা বিন্যাস সংক্রান্ত বিদেশ মন্ত্রকের ২০১৭ সালের একটি প্রস্তাব নিয়েও কথা হয় দুই দেশের মধ্যে।
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভূখণ্ড অদলবদল অস্বাভাবিক নয়। ২০১৫ সালে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্থলচুক্তিতে অনুমোদন মেলে, যার আওতায় ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়। পরিবর্তে ৫১টি ছিটমহল হাতে আসে ভারতের। ৪১ বছর ধরে চলে আসা বিরোধের অবসান ঘটে সেবার।
তবে ভূখণ্ড বিনিময়ের বিষয়টি সামনে আসতেই অশান্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মণিপুর থেকে আপত্তি উঠছে বিশেষ করে। 'ইম্ফল টাইমস' জানিয়েছে, Coordinating Committee on Manipur Integrity কেন্দ্রকে জানিয়েছে, সামান্যতম জায়গাও মায়ানমারের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। এতে মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন বলে সতর্ক করা হয়েছে। মেইতেই নাগরিক সমাজকে নিয়ে তৈরি যুগ্ম সংগঠন Coordinating Committee on Manipur Integrity.
নাগা উগ্রপন্থীদের সঙ্গে কেন্দ্রের শান্তিবৈঠকের সময় ২০১৯ সালে ওই সংগঠনেপ সূচনা হয়। Coordinating Committee on Manipur Integrity জানিয়েছে, মায়ানমারের হাতে জমি তুলে দেওয়া হলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ১৯৪৯ সালে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় এমনিতেই বড় অংশ হারাতে হয়েছে। আবারও একই ঘটনা ঘটলে রাজ্যের ভৌগলিক সীমান্ত বদলে যাবে, যা গ্রহণযোগ্য হবে না তাদের কাছে। 'আগুন নিয়ে খেলা' উচিত নয়, মণিপুরের মানুষের অমতে তাঁদের আঞ্চলিত অখণ্ডতা নিয়ে ছেলেখেলা করা উচিত নয় বলেও কেন্দ্রকে সতর্ক করেছে তারা।

