কলকাতা: প্রকৃতির রোষে বিপর্যস্ত নেপাল। বুধবার সকালের জল-প্রলয়ে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে নেপালের ৮টি জেলার একাধিক জায়গা। জল-কাদা-পাথরের ঢেউয়ে তছনছ হয়ে গিয়েছে বহু এলাকা। দোতলা বাড়ির ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে স্রোত। ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সব কিছু। কিন্তু, সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণে বাঁচলেন শতাধিক পড়ুয়া।
নেপালের স্কুলে শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধি প্রাণ বাঁচাল ৯০০ জন পড়ুয়ার। ঠিক সময়ে ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে পড়ুয়াদের বের করে দিয়ে তাদের প্রাণে বাঁচালেন শিক্ষক। পড়ুয়ারা স্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক পরপরই ত্রিশূলী নদীর হড়পা বান গিলে খেল স্কুল।
ক্যালেন্ডার বলছে, শিক্ষক দিবস আসতে এখনও ৪ দিন। কিন্তু এ বছরের শিক্ষক দিবস বোধহয় আগাম হয়ে গেছে গত বুধবারই। মৃত্যু উপত্যকার মাঝে তিনিই তো ত্রাতা। যাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত এযাত্রায় বাঁচিয়ে দিল ৯০০ পড়ুয়াকে। সেদিনের বুধবারের সকালটা ছিল ভয়ঙ্কর। একদিকে ব্ল্যাকবোর্ডে তখন মাস্টারমশাই চক দিয়ে লিখছেন। অন্যদিকে ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেমে আসা মৃত্যুদূত তার দু'পাশের গ্রাম মুছতে মুছতে এগিয়ে আসছে। প্রচণ্ড গতিতে, একেবারে রুদ্ররূপ নিয়ে।
- ক্লাসরুমে পড়ে ব্যাগ, টিফিন বক্স ! বিধ্বস্ত নেপালে এখনও পর্যন্ত কত মানুষ নিখোঁজ ? কত দেহ উদ্ধার ?
নেপালের ত্রিশূলীর ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুল। বিপর্যয়ের সকালে স্কুলে ছিল ৯০০ পড়ুয়া। হঠাৎ শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কাছে ছুটে আসেন স্কুলের হিসেবরক্ষক। খবর দেন, ত্রিশূলী উপত্যকার দিকে এগিয়ে আসছে হড়পা বান। এরপর হড়পা বান নিয়ে সতর্ক করে আরেকটি ফোন আসে তাঁর কাছে। ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছেন রাজেন্দ্র দাওয়াদি। কী করতে হবে তাও ঠিক করে ফেলেছেন রাজেন্দ্র দাওয়াদি। ছুটে গিয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দেন তিনি। স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন পড়ুয়াদের। স্কুল বাসের চালকদের ফোন করে বলেন, পড়ুয়াভর্তি বাস ঘুরিয়ে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে। পড়ুয়াভর্তি একটি সকুল বাস কাছেই একটি সেতু পার করে যাওয়ার পরই, ভেঙে পড়ে সেটি। জোর বাঁচা বেঁচে যায় বাসভর্তি পড়ুয়ারা।
ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, 'আমি ঠিক করলাম যদি আমি এখন বাচ্চাদের আটকাই, পড়াশুনা শুরু করাই, যদি খবরটা ভুল হয়, তাহলে একদিনের শিক্ষা নষ্ট হবে। কিন্তু যদি খবরটা সত্যি হয়, তাহলে গোটা জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিই এবং বাচ্চাদের ফেরত পাঠাই। সেইসময় আমরা ওখানে ৯০০ জন ছিলাম।'
একদিন এই স্কুলেই লেখাপড়া করেছেন। সেই স্কুল এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসাবশেষে। নেপাল সরকারের কাছে নতুন করে স্কুল বিল্ডিং তৈরি করে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। এই শিক্ষক দিবসে না হোক, অন্তত পরের শিক্ষক দিবসটা যেন এই স্কুলের উঠোনে পড়ুয়াদের সঙ্গে কাটাতে পারেন, সেই আশায়। এই স্কুলের এক পড়ুয়া জানান, স্যরের জন্যই প্রাণে বেঁচে গেছেন তাঁরা। দেখা হলে ধন্যবাদ জানাবেন স্যারকে।
Author : অরিন্দম প্রধান

