জয় চক্রবর্তী: কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতা দখল করবে? কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী? চতুর্থবারের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী হবেন? এই সমস্ত প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যবাসীর মনে। আর কিছুটা সময় পরেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের নির্ঘণ্ট অনুসারে বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন দুই দফায় সম্পন্ন হয়েছে।
চার মে, সোমবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসবেন তা নির্ধারণ হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ ৪ মে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার অলংকৃত করেছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আবার 'প্র্যাক্টিসিং ডক্টর' এই রাজ্যের হাল ধরেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। আবার রাজ্য পেয়েছিল গত ২০১১ সালে প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। সবকিছু নিয়েই আজ ইতিহাসের পাতা উল্টানোর চেষ্টা।
বর্তমানে নীল বাড়ির লড়াই। কিছুদিন আগে ছিল মহাকরণ দখলের লড়াই। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ঔপনিবেশিক জন্ম বৃত্তান্ত ১৯ শতকের শেষ দিকেই লুকিয়ে রয়েছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিলস অ্যাক্ট ১৮৬১ সালের সেই আইন মোতাবেক ১৮৬২ সালের ১৮ই জানুয়ারি ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলার 'লেজিসলেটিভ এসেম্বলি'। সেই আইনসভায় লেফটেন্যান্ট গভর্নরের উপস্থিতির পাশাপাশি মনোনীত সদস্যরা থাকতেন। এরপর অ্যাক্ট অফ ১৯১৯ অনুসারে ১৯২১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় 'দ্য বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল'। ১৯৩৬ সালে ভারত সরকারের আইন অনুসারে আগের এসেম্বলি এবং পরবর্তী কাউন্সিল এই দুটোই বাংলার আইনসভার দুটো কক্ষ হিসাবে ধরা হতো। ব্রিটিশ আমলে বেঙ্গল প্রভিন্সের সরকার প্রধান কেই বলা হতো 'প্রাইম মিনিস্টার অফ বেঙ্গল'। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ বাংলায় প্রথম 'প্রাইম মিনিস্টার অফ বেঙ্গল' ছিলেন আব্দুল কাসেম ফজলুল হক। এই পথে আসীন হয়েছিলেন হুসেন শাহিন সুরাবরদী। ব্রিটিশ বাংলার প্রাইম মিনিস্টার বদলে গেল পরবর্তীতে চিফ মিনিস্টার হিসাবে। ১৯৪৭ সাল ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা এসে গেল। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন জহরলাল নেহেরু। ভারতের স্বাধীনতার পর রেজিস্ট্রেটিভ এসেম্বলি সদস্যরা প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯৪৭ সালের ২১ নভেম্বর। বিলুপ্ত হয়ে যায় বেঙ্গল রেজিসলেটিভ কাউন্সিল। বাংলা পায় পশ্চিমবঙ্গের আইনসভা।
দেশের স্বাধীনতার পরে আরও একটা পরিবর্তন হয়েছিল। সেটা হল 'প্রাইম মিনিস্টার' তকমা মুছে গেল। প্রশাসনিকভাবে সূচিত হলো 'চিফ মিনিস্টার'। মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীনতার সময় প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে প্রথম বার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। লোকসভা এবং বিধানসভা দুটোতেই নির্বাচন হয়। এই রাজ্যে লোকসভার মোট আসন ছিল ৩৪ টি এবং বিধানসভার আসন ছিল ২৩৮ টি। বাংলার প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৮ লক্ষ। প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৮ টি আসনের মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় কংগ্রেস। ১৫০ টি আসন দখল করেছিল। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে সিপিআই ২৮, ফরওয়ার্ড ব্লক (মার্কসিস্ট গ্রুপ) ১১, কিষান মজদুর প্রজা পার্টি ১৫ টি আসন পেয়েছিল। পাশাপাশি ভারতীয় জনসংখ্যা পেয়েছিল ৯টি আসন। এরপর একে একে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন অনেকেই। ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান এবং তৃণমূল সরকারের পত্তন। পশ্চিমবঙ্গ পেল প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে। সেই ২০১১ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক শক্ত পোক্ত নিরাপত্তার মধ্যেই গণনার কাজ সম্পন্ন করবে বলেই সবাই মনে করছে। এবং সোমবার দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কে হবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।

