বাংলাহান্ট ডেস্ক: মধ্য আফ্রিকায় রীতিমতো চোখ রাঙাতে শুরু করেছে ইবোলা ভাইরাসের (Ebola Virus) সংক্রমণ। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মুখে এখন কঙ্গো। শনিবার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসেব অনুযায়ী সেখানে অন্তত ৮৬৭ জনের শরীরে ইবোলার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর।
দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক হওয়ায় WHO এই পরিস্থিতিকে 'গ্লোবাল পাবলিক হেলথ এমার্জেন্সি' বা বিশ্বব্যাপী জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার একাধিক অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
ইবোলা ভাইরাসের (Ebola Virus) জেরে আফ্রিকার ৩ দেশে ভ্রমণে সতর্কবার্তা ভারতের
চিকিৎসক ও ভাইরোলজিস্টদের বক্তব্য, এ বারের সংক্রমণের জন্য দায়ী ইবোলার বিরল 'বুন্দিবুগিও' স্ট্রেন। এই স্ট্রেন নিয়ে উদ্বেগের কারণ, এখনও পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনও অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ তৈরি হয়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, এই ভাইরাসে মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। প্রথমে কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের একটি খনি এলাকায় সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। কিন্তু শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকা সেন্টার স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম, ওষুধ এবং পরীক্ষার উপকরণ এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছয়নি আক্রান্ত এলাকায়। ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করতে মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
উত্তরাখণ্ডের জঙ্গলে ভয়াবহ দাবানল, পুড়ল ১৪ হেক্টর বনভূমি! তদন্তে বন দফতর
ইবোলা সংক্রমণ (Ebola Virus) ইতিমধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে প্রতিবেশী উগান্ডাতেও। সেখানে দুই জনের শরীরে ইবোলা ধরা পড়েছে, যাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত দু'জনই সম্প্রতি কঙ্গো থেকে উগান্ডায় গিয়েছিলেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উগান্ডা সরকার কঙ্গোর সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। বিমান চলাচল এবং গণপরিবহণও সাময়িক ভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে খাদ্য ও জরুরি পণ্যবাহী গাড়িকে সীমিত অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সাপ্তাহিক বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষের জমায়েত এড়ানো যায়। একই সঙ্গে বহু দেশে বিমানবন্দর ও স্থলসীমান্তে স্ক্রিনিং এবং কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা আরও কড়া করা হয়েছে।
আফ্রিকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জেরে সতর্ক হয়েছে ভারতও। কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরামর্শ জারি করে ভারতীয় নাগরিকদের কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সফর না করার অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত দেশে বুন্দিবুগিও স্ট্রেনের কোনও আক্রান্তের সন্ধান মেলেনি। তবুও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিমানবন্দর ও অন্যান্য প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আফ্রিকায় থাকা ভারতীয়দের স্থানীয় স্বাস্থ্যবিধি কঠোর ভাবে মেনে চলতে, জ্বর বা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অসুস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কঙ্গো সরকার পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর বুনিয়ায় সমস্ত বিমান চলাচল সাময়িক ভাবে বন্ধ করেছে। সংক্রমণ রুখতে প্রশাসন স্থানীয় স্তরে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে তা আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতির জেরে মে মাসের শেষে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা ভারত-আফ্রিকা সম্মেলনও অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, WHO ইতিমধ্যেই নতুন ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রয়োজনীয় ডোজ় তৈরি হতে অন্তত আরও ৬ থেকে ৯ মাস সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্তদের দ্রুত পৃথকীকরণই সবচেয়ে বড় ভরসা। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ইবোলা সংক্রমণ (Ebola Virus) আগামী দিনে আরও বড় মানবিক সঙ্কটে পরিণত হতে পারে।

