বাংলাহান্ট ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের আবহে বড় কূটনৈতিক মোড়ের ইঙ্গিত মিলছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে নাকি নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে ইরান (Iran)।
দুই মার্কিন আধিকারিককে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের দেওয়া পাঁচ দফা শর্তের অন্যতম ছিল ইরানের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি তেহরান। তবু এই খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, তবে কি অবশেষে থামতে চলেছে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা?
ইউরেনিয়াম ইস্যুতে আমেরিকার শর্ত মানতে প্রস্তুত ইরান (Iran)?
রবিবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, শান্তিচুক্তির অধিকাংশ শর্ত মেনে নিয়েছে ইরান। তিনি ইঙ্গিত দেন, দীর্ঘ সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি হচ্ছে। তার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই সামনে আসে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের খবর। তবে এখনও পর্যন্ত ইউরেনিয়াম কীভাবে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া হবে, কোন আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া চলবে, বা কোথায় তা সংরক্ষণ করা হবে— সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও রূপরেখা প্রকাশ্যে আসেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, ইরান যদি সত্যিই এই পদক্ষেপ নেয়, তবে তা হবে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
এই ঘটনার আরও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, কয়েকদিন আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, দেশের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনও অবস্থাতেই বিদেশে পাঠানো হবে না। ফলে আচমকা অবস্থান বদলের সম্ভাবনা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মার্কিন চাপ এবং সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কাই হয়তো ইরানকে নরম অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। আবার অন্য অংশের মতে, দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চাপে থাকা তেহরান আপাতত সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক পথ বেছে নিতে পারে। যদিও গোটা বিষয়টি নিয়ে এখনও পর্যন্ত ইরানের বিদেশ মন্ত্রক কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার ইউরেনিয়ামকে আরও কিছুটা পরিশোধন করলেই তা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে। ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা আধিকারিকদের দাবি, এই মজুত থেকে একাধিক পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব। ফলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল আন্তর্জাতিক মহলে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রেই এই ইউরেনিয়ামের বড় অংশ সংরক্ষিত রয়েছে। সূত্রের খবর, ওই কেন্দ্রকে লক্ষ্য করেই সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন সেনাবাহিনী।
শান্তিচুক্তির জন্য আমেরিকার দেওয়া পাঁচ দফা শর্ত নিয়েও ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের তরফে জানানো হয়েছে, ইরানকে (Iran) একটি নির্দিষ্ট পারমাণবিক কেন্দ্র চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরান যে অর্থ দাবি করেছিল, তা দেওয়া হবে না বলেই স্পষ্ট জানিয়েছে আমেরিকা। অপরদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ইরানের বাজেয়াপ্ত বৈদেশিক সম্পদের প্রায় ২৫ শতাংশ ফেরত দেওয়া হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

কোয়েটায় সেনার ট্রেনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ! বালোচ বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত অন্তত ২৪ পাক জওয়ান
এখন গোটা বিশ্বের নজর একটাই প্রশ্নে, সত্যিই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ? গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে উত্তেজনা ক্রমশ বেড়েছে। তার জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান (Iran) যদি বাস্তবেই ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়, তবে তা শুধু কূটনৈতিক সাফল্য নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় স্বস্তির খবর হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা যে থেকেই যাচ্ছে, তা মানছেন কূটনৈতিক মহল।

