Wednesday, 10 Jan, 4.02 am Bangla Live

জেনারেল নিউস
যামিনীবুড়োর আগে কোনও বঙ্গবধূ খই আর গুড় মেখে মোয়া বানায়নি এমনটা সম্ভবত নয়

—‘আপ কা গাঁও কাঁহা হ্যায় ? ’
—‘আজ্ঞে কলকাত্তা হ্যায়… ’
—‘রসগুল্লা (রসো নয়) ওর মিশ্টি (মিষ্টি নয়) দই …’

দন্তবিকশিত করে অবাঙালিরা তো রসগোল্লার আর মিষ্টি দইয়ের জন্য পাগল। সে খাক আর না খাক। আদ্যাখলাপনা দেখলে গা-পিত্তি জ্বলে উঠবে । অথচ বাংলার তো কতই মিষ্টি—বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, কাটোয়ার ক্ষীরের পান্তুয়া, মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া, জনাই-বেলডাঙার মনোহরা, আরও কত্তো !

তবে এসব নিয়ে আলোচনা নয় থাক । আজ বরং পাতে পড়ুক মনমোহিনী মোয়া । মোয়ার সঙ্গে একেবারে সেঁটে গিয়েছে জয়নগর । জয়নগরের মোয়া । জিআই পর্যন্ত পেয়ে গিয়েছে। বাংলার রসগোল্লা আর জয়নগরের মোয়ার যদি টক্কর হয়, তবে অনায়াসেই  জিতে যাবে জয়নগরের মোয়া । কেন জানেন ? কারণ, গত বছর স্বীকৃতি মিলেছে  রসগোল্লার। আর মোয়া স্বীকৃতি পেয়েছে এর থেকেও দু’বছর আগে, ২০১৫-র ২৩
মার্চ । মানে মোয়া বয়সে বড়।

সত্যিই কি তাই ? মোয়া কি সত্যিই বড় ? এ তর্ক অবশ্য জিআই সার্টিফিকেটকে সামনে রেখে করবেন না । সাইজটা দেখুন । পাঁচ টাকার মোয়া কিন্তু পাঁচ টাকার রসগোল্লার থেকে বেশ খানিকটা বড়। তর্কবাজরা অবশ্যই প্রশ্ন তুলবেন, পনের টাকার ভাল মোয়াটা আর পনের টাকার রসগোল্লাটাও কি সাইজে এক ? দাদা, একটু তর্ক থামান । রসগোল্লা বড় হলেই রাজভোগ হয়ে যায় । আর মোয়া বড় হলে মোয়াই থাকে। তাছাড়া জানেন কি, রসগোল্লা অ্যাত্তো বড় হয় না । ফেটে যায়। (গুপী গাইন বাঘা বাইন-এর সেই ইয়া বড় রসগোল্লাগুলিকে টানবেন না । সেগুলি ছিল ময়দার মণ্ডের ওপর ছানার প্রলেপ)। মোয়ার মণ্ড যত খুশি বাড়াতে পারেন। কারণ, কনকচুরের খই আর নলেন গুড় পাকের পর ঘি ছড়িয়ে হাতে গোল্লা করলেই জয়নগরের মোয়া তৈরি হয়।

এবার আসা যাক কিছুটা ইতিহাস আর কিছুটা জনশ্রুতি প্রসঙ্গে—এখানেই রসগোল্লা হারিয়ে দেবে জয়নগরের মোয়াকে। কারণ রসগোল্লার জন্মদাতা নবীনচন্দ্র মিষ্টি রসে ছানার গোল্লা ফেলেছিলেন ১৮৬৪-তে । আর জয়নগরের (পড়তে পারেন বহড়া) মোয়ার আবিষ্কারক যামিনীবুড়ো মাত্র এক শতক আগে কনকচুরের খই আর নলেন গুড়ের সাহায্যে মোয়া তৈরি করে অতিথি অ্যাপায়ন করেছিলেন। জয়নগর বা বহড়াতেও দ্বি/ দেড় শতাব্দী প্রাচীন দোকান অন্তত আমার জানা নেই । এবার উপাদানের দিকে চোখ রাখলে কিন্তু মোয়া একশোয় একশো পাবে । আর রসগোল্লা শূন্য। প্রথমেই বলে রাখা ভাল, এ মোয়া কিন্তু জয়নগরের নয়, বাংলার মনমোহিনী মোয়া ।

রসগোল্লার প্রধান উপাদান ছানার বাংলায় প্রবেশ ষোড়শ শতকে, পর্তুগীজদের হাত ধরে। কিন্তু তার আগে থেকেই তো বাঙালি মিষ্টি মুখে আপ্যায়ন করে অতিথিকে। অন্নপ্রশান থেকে শুভ দৃষ্টি—একমাত্র সঙ্গী মিষ্টি। এ মিষ্টি যে শুধু ক্ষীরের নয়, তা লক্ষ্মী পুজোর উপাচার থেকেই বোঝা যায় । আজও তো লক্ষ্মীভোগে দেওয়া হয় মুড়ির মোয়া, নারকেল-চিড়ের মোয়া । খাদ্য ঐতিহাসিকরা তো সর্বদাই বলেন, ‘মোয়ার অন্যতম উপাদান খৈ বাংলাদেশের লোকজ উৎসবের এক আবশ্যিক অনুষঙ্গ।’ মোয়ায় ব্যবহৃত কনকচুর ধানের খইও অত্যন্ত প্রাচীন ।

কনকচুর ধান বাংলার মাটিতে মধ্যযুগ থেকে চাষ হয়ে আসছে। মধ্যযুগের ‘শূন্যপুরাণ’ গ্রন্থে যে আশিটি ধানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে কনকচুর অন্যতম। ‘শিবায়ন’ গ্রন্থেও কনকচুরের নাম পাওয়া যায়। আর মোয়ার অন্যতম উপাদান গুড় তো অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাঙালি হেঁশেলে বহমান ।

তাই যামিনীবুড়োর আগে কোনও বঙ্গবধূ সাধ করে খই আর গুড় মেখে মোয়া তৈরি করেননি এমনটা সম্ভবত নয় । তবে রসগোল্লাই হোক আর জয়নগরের মোয়া—তামাম বাঙালির কিন্তু আবেগ জড়িয়ে
এই দুইয়ের সঙ্গে । একটা চিনির রসের কেরামতি আর আরেকটাই গুড়ের মিষ্টি, নলেন গুড়ের সুবাস । দুটোই যে মিষ্টি । তাই বড়দা হোক বা ছোড়দা—রসগোল্লা আর মোয়া থাকবে পাশাপাশি, মিষ্টি হয়েই।

Dailyhunt
Disclaimer: This story is auto-aggregated by a computer program and has not been created or edited by Dailyhunt. Publisher: Banglalive
Top