তেহরান ও নয়াদিল্লি: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর সমুদ্রপথে বারুদের গন্ধ। ইজরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে পশ্চিম এশিয়া। এর মধ্যেই হরমুজ় প্রণালীতে ইরানি বাহিনীর হাতে আটক হল ভারতগামী লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ 'এপামিনোনডেস' । জাহাজের ২১ জন নাবিকের মধ্যে রয়েছেন রাজস্থানের সঞ্জয় কুমার, যাঁর পাঠানো বার্তায় উঠে এসেছে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা।
নিশানা যখন ভারতগামী জাহাজ: কী ঘটেছিল হরমুজ়ে?
ওমান থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে যখন জাহাজটি গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দরের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই ধেয়ে আসে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর ‘গানার বোট’।
সঞ্জয় তাঁর পরিবারকে ফোনে জানিয়েছেন:
"হরমুজ় প্রণালী পার হওয়ার সময় চারপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসছিল। কোনোক্রমে আমরা জাহাজের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে প্রাণ বাঁচাই।"
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহাজটিকে লক্ষ্য করে শুধু গুলি নয়, রকেটও ছোড়া হয়েছে। যদিও আইআরজিসি গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করে দাবি করেছে, জাহাজটি কোনো অনুমতি ছাড়াই তাদের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল।
উদ্বেগ ও কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ
আটক নাবিকদের মধ্যে ভারত ছাড়াও ফিলিপিনস, ইউক্রেন ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকরা রয়েছেন। ১৫ বছরের অভিজ্ঞ নাবিক সঞ্জয় মাত্র ২০ দিন আগেই সৌদি আরব থেকে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ইরানি হেফাজতে সুরক্ষিত আছেন বলে জানালেও, দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের।
- পরিবারের পদক্ষেপ: সঞ্জয়ের ভাই সুভাষ স্থানীয় বিধায়ক জয়দীপ বিহানির মাধ্যমে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (PMO) হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
- দাবি: ভারত সরকারকে অবিলম্বে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে সমস্ত ভারতীয় নাবিককে দেশে ফিরিয়ে আনার আর্জি জানানো হয়েছে।
খামেনেই পরবর্তী ইরান ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
এই ঘটনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। রবিবার সকালে তেহরান নিশ্চিত করেছে যে, ইজরায়েল ও আমেরিকার ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই। এরপরই ইরানজুড়ে শোক ও আক্রোশের আবহ তৈরি হয়েছে।
১. ক্ষমতার রদবদল: বর্তমানে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান-সহ তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল সাময়িকভাবে দেশ পরিচালনা করছে।
২. ট্রাম্পের কড়া বার্তা: পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "ওরা নাকি প্রত্যাঘাত করবে! যদি সেই সাহস দেখায়, তবে এমন আঘাত করা হবে যা পৃথিবী আগে কখনও দেখেনি।"
৩. বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাব: হরমুজ় প্রণালী বিশ্বের তেলের বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন। সেখানে ভারতগামী জাহাজে হামলা বা আটকের ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পণ্য পরিবহণের নিরাপত্তাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল-ইরান সংঘাত এখন কার্যত এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। একদিকে তেহরানের রাস্তায় খামেনেইয়ের জন্য কান্নার রোল, অন্যদিকে সমুদ্রপথে জাহাজে হামলা—সব মিলিয়ে ভারতসহ গোটা বিশ্বের নজর এখন হরমুজ়ের উত্তাল জলরাশির দিকে। নয়াদিল্লি কীভাবে এই জটিল পরিস্থিতি সামলে সঞ্জয়-সহ ভারতীয় নাবিকদের উদ্ধার করে, সেটাই এখন দেখার।

