তামিলনাড়ুর সাথানকুলামের বহুচর্চিত বাবা-ছেলে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে আদালত। ২০২০ সালে পি. জয়রাজ ও তাঁর ছেলে জে. বেনিক্সের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে ৯ জন পুলিশকর্মীকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা ছিল পুলিশি ক্ষমতার প্রভাব ও ভয়ভীতি।
তবে সমস্ত প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে বিচারের পথ প্রশস্ত করেছেন এক সাহসী নারী পুলিশকর্মী-হেড কনস্টেবল রেবতী। তাঁর নির্ভীক সাক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
### কী ঘটেছিল ২০২০ সালে
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে, যখন কোভিড বিধিনিষেধ চলাকালীন সামান্য বেশি সময় মোবাইলের দোকান খোলা রাখার অভিযোগে জয়রাজ ও তাঁর ছেলে বেনিক্সকে আটক করে পুলিশ। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্মম প্রহার ও গোপনাঙ্গে আঘাতের ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই বাবা ও ছেলে উভয়েই প্রাণ হারান। এই ঘটনায় গোটা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল।
### রেবতীর লড়াই ও সাহসিকতার বিবরণ
সাথানকুলাম থানায় কর্মরত থাকাকালীন নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ অপরাধের বিবরণ দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি রেবতী। তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল নিম্নরূপ:
* **রাজসাক্ষী হওয়া:** চাকরি, পরিবার বা জীবনের সুরক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও তিনি রাজসাক্ষী হওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
* **আদালতে জবানবন্দি:** জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, কীভাবে অভিযুক্ত পুলিশকর্মীরা জয়রাজ ও তাঁর ছেলেকে নির্মমভাবে আঘাত করেছিল। এমনকি নির্যাতনের সময় তারা মদ্যপানের বিরতিও নিয়েছিল।
* **সহমর্মিতা:** রেবতী জানিয়েছিলেন যে, তিনি আহত জয়রাজকে জল ও কফি দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। অত্যাচারের শব্দ সহ্য করতে না পেরে তিনি একসময় কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
* **শনাক্তকরণ:** সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
### ক্ষমতার চাপ ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
সাথানকুলাম থানা থেকেই সহকর্মীদের চাপ ও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছিল রেবতীকে। এমনকি জবানবন্দি দেওয়ার সময়ও বাইরের পুলিশকর্মীরা তাঁকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছিল। শুরুতে সই করতে ভয় পেলেও, পরে বিচারবিভাগীয় নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যে অনড় থাকেন। মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে পরবর্তীতে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদান করা হয়।
### রায়ের সম্ভাব্য প্রভাব
এই রায় এবং রেবতীর সাহসিকতা ভারতের বিচার ব্যবস্থায় একটি নজির সৃষ্টি করল। এটি প্রমাণ করে যে, অপরাধী যদি খোদ রক্ষকও হয়, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। একজন অধস্তন কর্মী হয়েও ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালী সহকর্মীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই দৃষ্টান্ত পুলিশ বাহিনীর ভেতরে সংস্কার এবং নৈতিক দায়িত্ববোধকে উদ্বুদ্ধ করবে। রেবতীর এই বলিদান ও সত্যনিষ্ঠা সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে।
একঝলকে
* **ঘটনা:** সাথানকুলাম থানায় পুলিশি হেফাজতে বাবা-ছেলের মৃত্যু।
* **শাস্তি:** ৯ জন অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর মৃত্যুদণ্ড।
* **প্রধান সাক্ষী:** হেড কনস্টেবল রেবতী।
* **নির্যাতনের ধরন:** লাঠি দিয়ে নির্মম মারধর ও অমানবিক শারীরিক লাঞ্ছনা।
* **ফলাফল:** ৫ বছর পর অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা প্রদান।

