আগামী শনিবার ব্রিগেড ময়দানে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। রাজপুরোহিত থেকে রাজনৈতিক মহল যখন এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের রাস্তায় ঝরল রক্ত। আততায়ীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন রাজ্যের প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ।
খুনের ধরন এবং পেশাদারিত্ব দেখে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার রাতে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথবাবু। সেই সময় আচমকা একটি গাড়ি তাঁর পথ আটকায়। মুহূর্তের মধ্যে বাইকে চড়ে আসা দুই দুষ্কৃতী খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে পর পর গুলি চালায়। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আততায়ীরা যে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে তা স্পষ্ট।
মেধাবী ছাত্র থেকে রাজনীতির আঙিনায়
পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর এলাকার বাসিন্দা চন্দ্রনাথের বেড়ে ওঠা রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে। এক সময় ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দিলেও আধ্যাত্মিকতার টানে সেই চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন। এরপর কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ময়দানেই নিজের জায়গা করে নেন তিনি। ২০১৯ সালে শুভেন্দু অধিকারী যখন রাজ্যের মন্ত্রী, তখন থেকেই চন্দ্রনাথ তাঁর আপ্তসহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত কয়েক বছরে তিনি কার্যত নেতার ‘ছায়াসঙ্গী’ ও বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল, সরকার গঠনে শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সাথে সাথে চন্দ্রনাথকেও বড় কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।
তদন্তে বিশেষ দল ও নিরাপত্তার কড়াকড়ি
এই হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমেছে সিআইডি এবং রাজ্য পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। ইতিমধ্যে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনে ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে, তবে তাতে ভুয়ো নম্বর প্লেট লাগানো ছিল।
শপথ অনুষ্ঠানের ঠিক আগে এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মধ্যমগ্রামের যশোর রোড ও চন্দ্রনাথের আবাসনের আশেপাশে মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। বারাসত মেডিক্যাল কলেজে বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনার প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা পড়বে, এখন সেটাই দেখার।

