Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story

'মশা নৌবহর' - হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট নৌকার ঝাঁক যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে

 NurPhoto via দক্ষিণ ইরানে ২০২৪ সালে একটি নৌ-কুচকাওয়াজের সময় তোলা ছবিতে ইরানের ছোট ও দ্রুতগতিতে আক্রমণকারী নৌকার একটি বহর দেখা যাচ্ছে

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের নৌবাহিনীকে "পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন", যা এখন "মেশিনগান লাগানো ছোট ছোট নৌকায়" সীমাবদ্ধ।

কিন্তু এসব "ছোট নৌকা"- যেগুলোকে কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক "মশা নৌবহর" হিসেবে অভিহিত করেন, এগুলোর 'হুল'ও আছে।

কয়েক মাস ধরে এগুলো বিশ্বের জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে ইরানের শাসকদের সহায়তা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর লক্ষ্য- বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানা এবং ওয়াশিংটনকে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করা।

কিন্তু এই 'মশা নৌবহর' কী এবং এটি এত কার্যকর প্রমাণিত হলো কীভাবে?

 BBC

'হয়রানি, ঘিরে ফেলা, বিভ্রান্ত ও ব্যাহত করা'

ছোট, দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌকার এই বহরটি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তৈরি করেন ইরানের শাসকরা।

যদিও ইরান-ইরাকের মধ্যে যুদ্ধে চলছিল, তবে ১৯৮০-এর দশকের সেই 'ট্যাংকার যুদ্ধ' পারস্য উপসাগরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তেলের জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত হয়।

ওই সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ইরানের প্রচলিত নৌবহর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।

এরপর শক্তিশালী নৌবাহিনীর মোকাবিলার জন্য ছোট ছোট নৌকার এই বহরের নকশা করা একটি সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।

এটি ইরানের বিস্তৃত কৌশলের একটি অংশ, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-মাইন, উপকূলভিত্তিক উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং পার্শ্ববর্তী দেশে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও অন্তর্ভুক্ত।

ক্ষমতাধর ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি পরিচালিত এই বহরটি প্রচলিত নৌযুদ্ধের জন্য তৈরি নয়; বরং "হয়রানি করা, ঘিরে ফেলা, বিভ্রান্ত করা এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার" জন্য- বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ গোলকার।

তিনি ইরানি শাসকদের বিরোধী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান (ইউএএসআই)-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা পদেও আছেন।

তিনি বলেন, "আইআরজিসি জানে যে প্রচলিত নৌযুদ্ধে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারবে না"। বরং, তাদের লক্ষ্য হলো উপসাগর অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর খরচ ও ঝুঁকি বাড়ানো এবং প্রণালিটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বহরের কৌশলের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি গুলি চালানো, সমুদ্রে মাইন পাতা এবং বিভিন্ন দিক থেকে উচ্চগতিতে নৌকার ঝাঁক পাঠানো।

দ্রুত আক্রমণকারী এসব নৌকার অনেকগুলোই মেশিনগান, রকেট বা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত।

অনেক নৌকা ইরান নিজেই তৈরি করেছে। আবার বেসামরিক কাজে বা মাছ ধরার জন্য আগে ব্যবহৃত হতো এমন নৌকাকে রূপান্তর করেও ব্যবহার করা হয়েছে।

হাডসন ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো কান কাসাপোগলুর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নৌকাগুলো সাশ্রয়ী এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য।

ফলে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ইরান বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং প্রতিপক্ষের উচ্চমূল্যের সম্পদ ও বৈশ্বিক সামুদ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে রাখতে পারে, বলেন কাসাপোগলু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সামগ্রিক লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটনকে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে চাপ দেওয়া এবং ভবিষ্যতের হামলা নিরুৎসাহিত করা।

অনেক নৌকা পানির খুব নিচুতে অবস্থান করে বলে রাডারে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন, যতক্ষণ না তারা খুব কাছে পৌঁছে যায়। এগুলোর বিষয়ে কার্যকর নজরদারির জন্য ড্রোন, হেলিকপ্টার বা টহল বিমান দিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

এই বহরের প্রকৃত আকার জানা যায় না, এর একটি কারণ হতে পারে অনেক নৌকা ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে গুহা, খাঁড়ি এবং ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়।

তবে অনুমান অনুযায়ী এ ধরনের নৌকার সংখ্যা ৫০০ থেকে এক হাজারেরও বেশি।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিয়মিতভাবে এই 'মশা নৌবহরকে' নিয়ে নৌ-মহড়া চালায়।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

 NurPhoto via প্রচলিত নৌযুদ্ধের জন্য এই বহর তৈরি নয়; বরং এটা তৈরি "হয়রানি করা, ঘিরে ফেলা, বিভ্রান্ত করা এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার" জন্য- বলেন সাঈদ গোলকার

'সামুদ্রিক গেরিলা যুদ্ধ'

বিশ্লেষকরা প্রায়ই ইরানের এই কৌশলকে সাগরে গেরিলা যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেন।

মার্কিন নৌবাহিনী খোলা সমুদ্রে সুযোগ পেলে ইরানের দ্রুতগামী নৌকাগুলো ধ্বংস করতে পারে, তবে আইআরজিসি সচেতনভাবে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে বলে জানান গোলকার।

"আইআরজিসি সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে চায় এবং এর বদলে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল, নৌকার ঝাঁক, মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের খরচ বাড়িয়ে দেয়," তিনি বলেন।

ইরান হারানো নৌকা প্রতিস্থাপন করতে পারে দ্রুত ও কম খরচে।

অন্যদিকে, বাণিজ্যিক চলাচল রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয়বহুল জাহাজ ও বিমান মোতায়েন করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জাহাজ ধ্বংস না করেও গুরুতর ঝুঁকির ধারণা তৈরি করা মাত্রই বীমা খরচ বাড়াতে পারে এবং কোম্পানিগুলোকে এই পথ এড়িয়ে যেতে প্রলুব্ধ করতে পারে।

এমনকি নৌ-মাইন থাকার আশঙ্কাও চলাচল ধীর বা বন্ধ করে দিতে পারে।

মাইনমুক্ত করার প্রক্রিয়া শেষ করতে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

 NurPhoto via ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এই 'মশা নৌবহর' পরিচালনা করে

ইরানের কৌশল কি কাজ করছে?

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় খুবই কমে গেছে।

রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম হরমুজ স্ট্রেইট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১০টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করছে-যা সাধারণ দৈনিক গড় ৬০টির মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির পর্যবেক্ষণ দল জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে এই চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।

৮ই এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর কিছুটা সময়ের জন্য কার্যক্রম বাড়লেও, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি ফের বিপরীতমুখী হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী পণ্যের ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে।

একইসঙ্গে প্রণালিতে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানায়, কাতারের দোহা শহরের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল (৪৩ কিলোমিটার) দূরে পণ্যবাহী একটি জাহাজ "অজ্ঞাত জায়গা থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের" হামলার শিকার হয়, যাতে সামান্য অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

পরে ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা জানায়, জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী ছিল এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ৫০০টি জাহাজ এবং ২০ হাজার নাবিক এই অবরোধে কারণে আটকে আছে।

এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে- যেটাকে কিছু বিশ্লেষক তেল সরবরাহ ক্ষেত্রে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

source: bbc.com/bangla

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: BBC Bangla