Dailyhunt

পশ্চিমবঙ্গে বুথ-ফেরত সমীক্ষায় কোন দলের কী অবস্থা?

 CEO West Bengalনির্বাচনের পরে ভোটিং মেশিন সুরক্ষিত স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন ভোটকর্মীরা

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় বা চূড়ান্ত পর্বের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরেই প্রকাশিত হয়েছে একাধিক বুথ-ফেরত সমীক্ষা। বেশিরভাগ এক্সিট পোলই সামান্য ভোটের ব্যবধানে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপির জয়ের অনুমান করছে।

মনে রাখা দরকার, এক্সিট পোলগুলো কেবলই আনুমানিক হিসাব।

পশ্চিমবঙ্গসহ যে চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, তার ভোট গণনা হবে চৌঠা মে, আসল ফলাফল জানা যাবে সেদিনই।

তবে প্রশ্ন হলো, ভোট দেওয়ার পরে ভোটারদের কাছ থেকে কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে যেভাবে নির্বাচনী ফলাফল অনুমান করার চেষ্টা করা হয় এই ধরনের বুথ-ফেরত সমীক্ষা বা 'এক্সিট পোল'-এর মাধ্যমে, তা কি আদৌ মেলে?

যে দেশগুলোতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হয় ভোটগ্রহণের সাথে সাথে, সেইসব দেশে এক্সিট পোলের অবকাশ থাকে না।

তবে যেখানে নির্বাচনী ফলাফলের অপেক্ষা করতে হয়, সেইসব দেশে এক্সিট পোল মানুষকে তর্ক-বিতর্কের রসদ অনেকটাই যোগায়।

বিবিসি বাংলাকে ইনস্টাগ্রামে ফলো করতে এখানে ক্লিক / ট্যাপ করতে পারেন

 CEO West Bengalভোট দিতে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের নারীরা

কীভাবে গণনা হয় এক্সিট পোল?

এক্সিট পোল - কথাটি শুনেই বোঝা যায়, যারা ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে এলেন, তাদের মতামত সমীক্ষা করে জানার বা অনুমান করার চেষ্টা করা হয়, নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রের মানুষরা কোন দলকে চাইছেন।

সমীক্ষকরা নির্বাচনী ক্ষেত্র জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ভোট দিয়ে বুথ থেকে ফিরে আসা মানুষদের কাছে তাদের মতামত জানতে চান।

মোট পাঁচটি ভাগে এই এক্সিট পোল গণনা করা হয়, এগুলো হলো:

  • অঞ্চলের জনবিন্যাস বিবেচনা করে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়। একে বলা হয় স্যাম্পলিং।
  • আগে থেকেই প্রশ্ন ঠিক করে রাখা হয়। ভোটারদের কাছে তাদের পছন্দের পার্টি ছাড়াও বয়স, লিঙ্গ ও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো জানতে চাওয়া হয়।
  • ভোটারদের নাম-পরিচয় সুরক্ষিত রেখে প্রতিনিধি এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করেন।
  • এর পর ভোটদানের হার ও অন্য কিছু ফ্যাক্টর বিশ্লেষণ করে এই তথ্যগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা হয়।
  • এর পরে এই সমীক্ষার রিপোর্টগুলোকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

এক্সিট পোলে মানুষের পছন্দের পার্টি বা তিনি কোন পার্টিকে ভোট দিলেন তা সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয় না। ভোটারের ইস্যু ও অন্যান্য প্রশ্ন থেকে অনুমান করা হয় যে তিনি কোন দলকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন।

যদিও ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১২৬ নম্বর ধরার এ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে শেষ না হলে এক্সিট পোলের ফলাফল প্রকাশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এক্সিট পোল প্রকাশ করে সমীক্ষাকারী সংস্থাগুলো অবশ্য জানিয়ে দেয় যে এতে 'মার্জিন অফ এরর' বা কিছু কমবেশি হওয়ার অবকাশ থাকতে পারে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

 BBC২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের বুথ ফেরত সমীক্ষার ফলাফল; চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে চৌঠা মে

কী বলছে পশ্চিমবঙ্গের এক্সিট পোলের ফলাফল?

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জরিপ সংস্থার করা এক্সিট পোলগুলোর মতামতের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২৯৪টি আসন আছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৪৮টি আসন প্রয়োজন।

'পি-মার্ক এক্সিট পোল' অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১১৮-১৩৮টি আসন, বিজেপির দিকে যেতে পারে ১৫০-১৭৫টি আসন এবং অন্যান্য দলগুলোর ২-৬টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

'ম্যাট্রাইজ এক্সিট পোল' অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ১২৫-১৪০টি আসন যেতে পারে, বিজেপি পেতে পারে ১৪৬-১৬১টি আসন এবং অন্যান্যরা পাবে ৬টি থেকে ১০টি আসন।

'পিপলস পালস এক্সিট পোল' অনুযায়ী টিএমসি পাবে ১৭৭-১৮৭টি আসন, বিজেপি পাবে ৯৫-১১০টি আসন, কংগ্রেস পাবে ১-৩টি আসন এবং বামেরা পেতে পারে ১টি আসন।

'চাণক্য স্ট্র্যাটেজিস এক্সিট পোল' অনুযায়ী টিএমসি পাবে ১৩০-১৪০টি আসন, বিজেপি পাবে ১৫০-১৬০টি আসন এবং অন্যান্যরা পাবে ৬-১০টি আসন।

 BBCগত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন সংস্থা যে বুথ ফেরত সমীক্ষা চালিয়েছিল, তার সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলে বড় পার্থক্য দেখা গিয়েছিল

সাম্প্রতিককালে এক্সিট পোলের ভুল অনুমান

গত কয়েক বছরে একাধিক ভুল অনুমানের ফলে এক্সিট পোলের উপর সাধারণ মানুষের ভরসা কমছে।

২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ডাক দিয়েছিলেন, "এইবার চারশো পার।"

অর্থাৎ লোকসভায় দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন তিনি। একাধিক এক্সিট পোল দেখিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর সেই দাবিই সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু সেটা আর বাস্তবে আর ঘটেনি।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বেশি আসন পাবে বিজেপি। এই দুই অনুমানই শেষ পর্যন্ত মেলেনি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের এক্সিট পোল এর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করা হয়।

এছাড়াও বিহারে ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এক্সিট পোলগুলো বিজেপির জয় অনুমান করেছিল একটি বড় মার্জিনে। কিন্তু সেটা হয়নি। বিজেপি জিতলেও মার্জিন ছিল প্রায় নগণ্য।

২০২৪ সালে হরিয়ানা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সবকটি সমীক্ষাই কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, বড় মার্জিনে জয়লাভ করেছে বিজেপি।

এইসব ব্যর্থতা থেকে বোঝা যায়, এক্সিট পোল শুধু ভোটারদের সেন্টিমেন্টের উপর ভিত্তি করে ফলাফল দেয়, যা চূড়ান্ত ফলাফলের প্রতিফলন নাও হতে পারে।

 Sudipta Das/NurPhoto via ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে অধিকাংশ আসন জয়ের পরে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের উচ্ছ্বাস

কেন এত জনপ্রিয় এক্সিট পোল?

এক্সিট পোল প্রথম কে করেছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

১৯৬৭ সালে ডাচ সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ মারসেল ভন ড্যাম ড্যানিশ পার্লামেন্টের ফলাফল ঘোষণার আগেই তা নির্ণয় করে ফেলেছিলেন।

একই বছর সিবিএস নিউজে কর্মরত এক আমেরিকান সাংবাদিক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ তার পদ্ধতিতে এক্সিট পোল করে ভোটের ফলাফল নির্ভুলভাবে নির্ণয় করেন। এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়।

ভারতে প্রথম বুথ ফেরত সমীক্ষা করা হয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দূরদর্শনে। ১৯৯৬ সালে সিএসডিএস নামের একটি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে একটি সমীক্ষা করে দূরদর্শন।

সেই সমীক্ষার ফল চূড়ান্ত ফলাফলের এতটাই কাছাকাছি ছিল যে বহু মানুষের কাছে এক্সিট পোলের ফলাফল বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে শুরু করে।

তার পর থেকে ভারতের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোও এক্সিট পোল সম্প্রচার শুরু করে।

 BBCবিবিসি বাংলার লাইভ অনুষ্ঠানের আলোচনা এক্সিট পোলের প্রসঙ্গ উঠে আসে

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

বিবিসি নিউজ বাংলার সঙ্গে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ২৯শে এপ্রিল উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ।

সেই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "এক্সিট পোল তখনই ফলে যখন কোনোি পার্টির পক্ষে অনেকটা বড় জনমত তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গে এ বছর রেকর্ড হারে ভোটদান হয়েছে। এক্সিট পোলগুলো সাধারণত তিন শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশের মার্জিন অফ এরর বলে থাকেন।"

তিনি জানান, "পশ্চিমবঙ্গে অনেক সিটেই এই পরিমাণ মার্জিনেই ভোটের ফলাফল পাল্টে যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপির ভোট শতাংশ খুব কাছাকাছি।"

সাংবাদিক অর্ক দেব জানান, "৪৪টা এমন আসন রয়েছে যেখানে সবথেকে বেশি নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। ফলে এই ৪৪ টা আসনে কী হতে চলেছে, তা কারও পক্ষে নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়।"

source: bbc.com/bangla

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: BBC Bangla