পাখি নয়, তবু তার উড়িবার জাগে বড়ো সাধ..আরশোলা আবার পাখি, ছ্যাঃ ! তেলাপোকা, তেলাচোরা, তেলচাট্টা ।
গায়ে যদি বসে উড়ে এসে,
ছুটে যাবে হাসি-মস্করা !
উড়ে এসে জুড়ে বসা এই ধিকৃত প্রাণীটির কিন্তু না খেয়ে একমাস বাঁচার ক্ষমতা আছে!
আমাদের বর্ণ পরিচয়ের সর্বজননিন্দিত রাখালের চেয়েও অভাগা এই জীব একজোট হলে নাকি রাজার রাজত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমনও শোনা যায়।
পায়ের নিচে হঠাৎ আরশোলা দেখলে মন্ত্রীও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হন। মুণ্ডু কেটে গেলেও এরা নাকি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে,
কী সাংঘাতিক! সিং নেই তবু নাম তার সিংহ-র মতো ডানা আছে তবু পাখি নয় আরশোলা। এতেই বোঝা যায় কি বিশাল অভাগা এরা! হতভাগা আর কাকে বলে। তবে হ্যাঁ, মেনে নিতে দ্বিধা নেই যে, এরা ঘরের ত্রাস! অবশ্য দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে এরা যে বাঁধা পড়তে চায় না সেটা এদের কাজকর্ম দেখলেই বোঝা যায়।
কোথাও পারমাণবিক বোমা পড়লেও আরশোলা বেঁচে থাকবে। এমনই এদের কইমাছের জান যে, বিশাল তেজস্ক্রিয়তার মধ্যেও বেঁচে থাকতে পারে এরা। যতই মারার চেষ্টা হোক না কেন, একেবারে থেঁতলে পিষে না ফেললে এরা কিন্তু ফিরে আসবেই!
এমনই এদের আয়ুর জোর। আর এমন নাছোড়বান্দা দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। ট্রান্সফরমারের সঙ্গে এদের খুব মিল। এরা খুব দ্রুত দৌড়ে, উড়ে, হেঁটে, উল্টিয়ে এবং দেহকে পাতলা করে ফাঁক-ফোকর কাজে লাগিয়ে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
আরশোলা যদি করে
উড়তে শুরু
বীরপুরুষেরও বুক
ভয়ে দুরুদুরু !
অথচ অতি বড়ো হিরোর পিলে চমকে দেওয়া এই ফাইটার পতঙ্গটির এমনই দুর্ভাগ্য যে , মানুষ, বিশেষত মেয়েরা এদের একেবারেই সহ্য করতে পারে না। দেখলেই ভয় পায়। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। বেচারা আরশোলা! পৃথিবীর সব বিপদ একপাশে, আর উড়ন্ত আরশোলা নাকি অন্যপাশে! এরা বিনা ভাড়ার ভি আই পি অতিথি হলেও ভীষণ কষ্টসহিষ্ণু।
মারাঠি ভাষায় ' ঝুরল ' বলা হয় আরশোলাদের। গুজরাটি ভাষায় বলা হয় ' ভান্দো ' । পাঞ্জাবি এবং হিন্দি ও উর্দু বলয়ে এদের বলা হয় ' তিলচট্টা ' । বলা বাহুল্য, এদের কর্পোরেট তথা সম্মানজনক নাম, যা এখন ভীষণ চর্চিত, যে নামটি জানেন দেশের দশ জনে , তা হলো ' ককরোচ ' ( Cockroach ) , যা আদতে এসেছে একটি স্প্যানিশ শব্দ ' কুকারাচা ' ( Cucaracha ) থেকে ।
অষ্টোত্তর শতনাম এদের আছে কিনা জানা নেই, তবে এদের আরও একটা নাম ' কর্কটকীট ' । এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম হলো এরা সর্বভুক, অমেরুদণ্ডী এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম।
প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি বছর আগে ( ডাইনোসর সময়েরও বহু আগে ) পৃথিবীতে আরশোলার অস্তিত্ব ছিল। তারও আগে হয়তো আরশোলার উৎপত্তি বা আবির্ভাব।
জীবাশ্ম ও জিনগত গবেষণায় জানা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতি , যেমন জার্মান আরশোলার আদি উৎস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা হলেও বর্তমানে এরা উষ্ণ ও ক্রান্তীয় অঞ্চলসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এরা সন্ধিপদী ইনসেক্টা শ্রেণীর প্রাণী, যাদের দেহ মাথা, বুক ও পেট -- এই তিনভাগে বিভক্ত। এরা মুখ বা নাক দিয়ে নয়, বরং শরীরের পাশের ছোট ছিদ্র বা ট্রাকিয়া ( Trachea ) দিয়ে শ্বাস নেয়। মাথা কেটে গেলেও এরা বেশ কয়েকদিন বাঁচতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ৪০০০- এর বেশি প্রজাতির আরশোলা রয়েছে। গবেষণায় জানা যায়, জার্মান আরশোলা প্রায় ২১০০ বছর আগে এশিয়ান আরশোলা থেকে বিবর্তিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে যে, এদের উৎপত্তি মায়ানমার বা ভারতে । এরপর এরা গত ১০০০ বছরে পশ্চিমের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
ডাচ ও বৃটিশ বানিজ্যপথ দিয়ে পশ্চিমে যাওয়া পণ্যের মাধ্যমে আরশোলা সেখানে পৌঁছেছিল। এছাড়াও, সৈন্যদের জন্য পশ্চিম এশিয়া থেকে পাঠানো রুটির চালানের মাধ্যমে আরশোলা পশ্চিম দেশগুলোতে পৌঁছেছিল।
যা হোক, আরশোলা শব্দটির সঙ্গে ' শোলা ' শব্দটি যুক্ত। শোলা শব্দের বেশ কয়েকটি অর্থ আছে। তার মধ্যে একটি হলো ' আগুনের শিখা ' ।
অতএব, সাধু সাবধান !

