২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে বেলেঘাটা অঞ্চলে এসে রাজু নস্করের (Raju Naskar) নাম ধরে কড়া হুমকি দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬ সালে বিধানসভা ভোটের পরে নবান্নে এক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) মুখেও শোনা গিয়েছিল বিতর্কিত বাহুবলী রাজু নস্করের নামে কটাক্ষ।
এরপর রাজুর আবার গ্রেফতার হওয়া এবং জামিন পাওয়া। সেসব এখন অতীত। বেলেঘাটায় কান পাতলে এখন শোনা যাচ্ছে শুভেন্দুর সেরা ভক্তের নাম রাজু নস্কর। 
শুধু অন্তরাল থেকে ঘুঁটি সাজানোই নয়; রাজু এখন প্রকাশ্যে শুভেন্দুর সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট শেয়ার করে বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান। রাজুবাহিনী নিশ্চিত, এখন টেনশন কমেছে, তারা যাই করুক, পুলিশ এখন ধরবে না। নেপথ্যকাহিনি জমজমাট। যতই পরিবর্তন হোক, রাজু নস্কর আবার লাগাম ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছে, যে যখন মসনদে, তাকে বশে আনবার ওষুধ তার হাতে। 
একসময়ে বামজমানায় বেলেঘাটার বিতর্কিত বাহুবলী রাজু ছিল সিপিএমের (CPIM) সঙ্গে। মানব মুখোপাধ্যায়ের ভোট করাতো। এরপর ২০১১-তে পালাবদল। রাজু তৃণমূল (TMC) হয়ে গেল। ক্রমশ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পরেশ পালের দক্ষিণহস্ত হয়ে উঠল। কুণাল ঘোষকে (Kunal Ghosh) মঞ্চে বলতে শোনা গেছে, "রাজু, বাহুবলী তকমা ছেড়ে সামাজিক কাজ করো। তোমার সংগঠনকে ঠিকভাবে কাজে লাগাও। মাথা গরম কোরো না। বয়স হচ্ছে।"
এসব কথা রাজু শুনেছে বটে। তবে মেনেছে বলে কোনও অপবাদ তার শত্রুরাও দিতে পারবে না। এবার ভোটের আগে এবং পরে একাধিক বিতর্কে জড়ায় রাজু। গ্রেফতার হয়। তবে জামিন পেলেও তাকে তৃণমূলপ্রার্থীর হয়ে ভোট করতে দেখা যায়নি। তৃণমূল সন্তর্পণে বিতর্ক এড়িয়ে ভোট করে। তাছাড়া এলাকার একাধিক পুরপিতা রাজুকে বাদ রেখেই ভোট করানোর পক্ষে ছিলেন। কারণ রাজুর 'ত্রাস' ইমেজকে তাঁরা এড়াতে চেয়েছিলেন। এমনকী রাজুর ওয়ার্ডের অলোক দাস, অলোকানন্দা দাসরা রাজু দূরের কথা, রাজুর বাহিনীর কাউকেও ঘেঁষতে দিতে চাননি। তাঁদের যুক্তি ছিল, ভয়ে মুখে কিছু না বললেও সাধারণ মানুষ রাজুর উপর বিরক্ত। বারবার নানা বিতর্কে জড়িয়েছে সে। একবার একটি বিস্ফোরণ নিয়ে লকেট চট্টোপাধ্যায়ও তোপ দেগেছিলেন। তাছাড়া দাদাগিরি, সিন্ডিকেট, দখল, মারামারি, ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে অভিযোগ, প্রমোটারির নানা অভিযোগ বারবার উঠেছে। শুভেন্দু সেসব নিয়েই রাজুকে আক্রমণ করতেন প্রকাশ্যে। রাজু ক্রমশ ব্যবসায়ী ইমেজে নিজেকে তুলে ধরলেও কিছুদিন অন্তরই বিতর্কে জড়িয়েছে। তবে বাহুবল, অর্থবলে গুরুত্ব পেলেও ঘনঘন নেতা বদলানোই সেভাবে বিশ্বাস করেনি কেউ। আজও তাকে একটি স্লটে ব্যবহার করার খেলা চলছে। রাজু বুঝে বা না বুঝে তা নিয়েই এলাকায় গ্রিপ ফেরাতে চাইছে।
অতি সম্প্রতি পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন হয়। রাজুর এক অভিভাবক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই (NCPI) করে বিজেপির (BJP) সঙ্গে হাত মেলানোর অঙ্ক কষেন। বিজেপির একটা অংশ তাতে মদত দেয়। রাজু সুদীপের অনুগামী হিসেবে ক্ষমতার বৃত্তে ঢোকার সুযোগ পেয়ে যায়। তার জন্য পুরনো পরিচিতদের সঙ্গে উল্টো খেলতেও তার সমস্যা ছিল না। বেলেঘাটার ঘরে বাইরে সমস্যা ঠেকাতে সুদীপপন্থী সেজে বিজেপির কাছাকাছি থাকাটা তার কৌশলী অঙ্ক। কারণ সরাসরি বিজেপি তাকে নিতে চাইবে না। একদিকে পুরনো একাধিক মামলায় গ্রেফতার, হয়রানি, অন্যদিকে ব্যবসায় প্রশাসনিক আক্রমণ, বেআইনি বাড়ি ভাঙা, হোটেল বন্ধ; এছাড়াও কিছু পুরনো শত্রুতা; এসব থেকে বাঁচতে রাজু আরেকবার দলবদলের পথ বেছে নেয়। এক্ষেত্রে, সর্বত্র চর্চা, বিজেপির শীর্ষমহলের সঙ্গে তার সেতুবন্ধন করে দেয় তারই অভিভাবক। রাজুশিবিরের বক্তব্য, দাদার জামিন হল। ক্রমশ ব্যবসার জট খুলল। বন্ধ রেস্তোরাও চালু হল। আপাতত কথায় কথায় গ্রেপ্তারের ভয় নেই। যাদের অপকীর্তির জন্য পুলিশ খোঁজে, তাদের আর পালাতে হয় না। পাড়াতেই আড্ডা মারে। বেলেঘাটা থানার ওসি খুঁজে পান না।
আজ জঙ্গলমহল সফর মুখ্যমন্ত্রীর, লোধা-সবর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা
এদিকে বিজেপি এই ইস্যুতে দুভাগ। পার্থ চৌধুরী, রবিকান্তের গোষ্ঠী চায় বিতর্কিত রাজুবাহিনীকে দূরে রাখতে। এদের বক্তব্য রাজুদের কাছে নিলে এলাকায় বিজেপির ভাবমূর্তি ধ্বংস হবে। অন্য অংশ চায় রাজুবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে দাপট বাড়াতে, পুজো বড় করতে। বিজেপির নব্য দুএকটা পুজো নাকি অদৃশ্য জাদুতে বড় হয়ে গেছে। শোনা যাচ্ছে, পুরসভা ভোটে রাজু তার ছেলে স্বরাজকে সুদীপের এনসিপিআই থেকে দাঁড় করাবে। বিজেপি হজম করতে বাধ্য হবে। কারণ রাজুকে ঠেকানোর ক্ষমতা ওই এলাকায় বিজেপির নেই। রাজুবাহিনী বলতে শুরু করেছে, "বস ইজ ব্যাক।"
আসলে সুদীপ এবং গদ্দারবাহিনী পুরভোটের যে প্রস্তুতির কথা ভাবছে, তাতে রাজুকে দরকার। আর তৃণমূলকে হারানোর জন্য রাজুর প্রয়োজনীয়তা বিজেপির একটা অংশ বুঝেছে। অনেক অপ্রিয় কাজ রাজুদের দিয়ে করানো যাবে, যার দায় বিজেপির থাকবে না। একদা উপকার করা লোকের উপর রাজুবাহিনীকে দিয়ে হামলা করিয়ে তা যাচাই করে নিয়েছে বড়কর্তারা। আপাতত নিজের সুবিধার জন্য রাজু যে কোনো কাজ করতে পারে। অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ। রাজুশিবিরও বুঝেছে, সুদীপ এখন সাময়িক 'হাইফেন' মাত্র। আসল ক্ষমতা শুভেন্দুর কাছে। এই সময়টাকে ব্যবহার করে সরাসরি শুভেন্দুর গুড বুকে গেলে এই এলাকায় রাজুকে আর কোনও বিজেপিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। রাজু তাই সরাসরি শুভেন্দুর ভক্ত হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পোস্ট শেয়ার করছে। তার ছেলে স্বরাজও করছে। তবে এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে আপাতত অন্তরালে থেকেই যা করার করছে। একটা সময় যে কাউন্সিলরদের সঙ্গে রাজুর দূরত্ব ছিল, তাদের মধ্যে যারা সুদীপের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, রাজু সেখানে দূরত্ব কমাচ্ছে। রাজুবাহিনীর বক্তব্য, দাদা হোমওয়ার্ক করছে। সময় এলেই দেখা যাবে বেলেঘাটায় রাজু নস্করই শেষ কথা।

