Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
'হেডোনিজম', উৎপল সিনহার কলম

'হেডোনিজম', উৎপল সিনহার কলম

স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে ,

সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে ।

পরার্থপরতাই কি সর্বোৎকৃষ্ট সুখ ? এর জবাবে কেউ গেয়ে উঠতেই পারে , ' সুখের কথা বোলো না আর , বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি ' । দুনিয়া বদলানোর স্বপ্নে মশগুল মেধাবীদের পরামর্শ দেওয়া হয় দুনিয়া বদলের আগে নিজেদের বদলানোর।

পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায় মেঠো আটপৌরে প্রবচন,' আপনি বাঁচলে বাপের নাম ' । যে নিজেই অসুখী, সে অন্যদের সুখের ব্যবস্থা করবে কী করে ? এইসব চাপান- উতোর শুরু হলেই অবধারিতভাবে আলোচনায় আসে ' হেডোনিজম ' অর্থাৎ সুখবাদ। এ হলো এমন একটা দর্শন, যার মূল কথা সুখ বা আনন্দ। তবে এর অর্থ কিন্তু ' যা খুশি তাই করো ' নয়।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাস বলতেন : সবচেয়ে বড়ো আনন্দ হলো সেই আনন্দ, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং কোনো বড়ো কষ্টের জন্ম দেয় না। বিলাসিতা নয়, সরল আনন্দ, ভালো চিন্তা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সাহচর্য, গভীর বন্ধুত্ব, শান্ত পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চা। অর্থাৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন আনন্দ নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত সচেতন আনন্দ। অকপট, ছলনাহীন, অকৃত্রিম।

হেডোনিজম বা সুখবাদ হলো এমন একটি দার্শনিক মতবাদ, যা আনন্দ বা সুখকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য, পরম কল্যাণ এবং নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড বলে মনে করে । গ্রিক শব্দ ' hedone ' ( আনন্দ ) থেকে উদ্ভূত এই দর্শন অনুসারে, বেদনা বা দু্ঃখ বর্জন করে সর্বোচ্চ আনন্দ অর্জন করাই মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সুখবাদীরা মনে করেন, যা আনন্দ দেয় তা ভালো এবং যা দুঃখ বা যন্ত্রণা দেয় তা খারাপ।

Ethical Hedonism বা নৈতিক সুখবাদ অনুসারে,আনন্দই জীবনের একমাত্র কাম্যবস্তু। Psychological Hedonism বা মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ অনুসারে, মানুষ স্বভাবতই আনন্দ খোঁজে এবং দুঃখ এড়াতে চায়। শারীরিক ও মানসিক আনন্দ ছাড়া বেঁচে থাকাটাই যেন অর্থহীন। সাধারণ অর্থে,হেডোনিস্ট বা সুখবাদী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি নিজের সুখ ও আনন্দকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সহজ কথায়, হেডোনিজম হলো, আনন্দ গ্রহণ এবং দুঃখ বর্জন। চার্বাক দর্শনের বিখ্যাত প্রবাদ সুখবাদের খুব কাছাকাছি থাকে, যেখানে বলা হয়েছে, " ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ , যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ " ।

হেডোনিজমের সবটাই কি ভালো ? নাকি এই দার্শনিক মতবাদের অনেকটাই জীবন ও সভ্যতার বিরুদ্ধে যায়? নিন্দুকেরা তো বলেন, সুখবাদ ও ভোগবাদ একই পাড়ার বাসিন্দা। একথা সত্যি যে, সুখবাদ মানুষকে ইতিবাচক অনুভূতি দেয়, তৃপ্ত থাকার আশ্বাস দেয়। মানসিক ও শারীরিক কষ্ট ও বেদনাকে এড়িয়ে চলার পথ দেখায়, যা জীবনকে আরামদায়ক করে তুলতে সাহায্য করে। প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ্য করে তোলার প্রয়াস মানসিক চাপ ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা কমিয়ে বর্তমানে বেঁচে থাকতে উৎসাহিত করে এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেঁচে থাকার স্বাধীনতা দেয়।

তবে সুখবাদের নেতিবাচক দিকগুলিকেও উপেক্ষা করা যায় না। কেবল বর্তমান আনন্দের পিছনে ছুটলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি, আর্থিক সমস্যা এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত সুখের আসক্তি মানুষকে আত্ম - ধ্বংসের দিকে চালিত করে, যা কখনওই কাম্য নয়। সুখ ও দুঃখের সুষম ভারসাম্য না থাকায় স্থায়ী আনন্দ দূরের বস্তু হয়ে ওঠে। সুখবাদ মানুষকে অবশ্যম্ভাবী স্বার্থপরতার পথে চালিত করে , যা মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে দেয় না। মানবিকতা তথা মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে মানুষের আর থাকে কি ?

কেউ কেউ বলেন, হেডোনিজম হলো এক ধরনের ' শাঁখের করাত '। পরিমিত ও সুষম সুখবাদ ( যা আসলে সোনার পাথর বাটি ) জীবনের মান উন্নয়নে সহায়ক হতেও পারে, কিন্তু লাগামহীন আনন্দ অন্বেষণ শেষপর্যন্ত কষ্ট, একাকীত্ব ও শূন্যতা ডেকে আনে।

_

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Biswa Bangla Sangbad