২০০৭ সালের সেই উত্তাল স্মৃতি সামলে প্রায় দুই দশক পর ফের তিলোত্তমার মাটিতে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত তসলিমা নাসরিন। মাঝে কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৯ বছর। কলকাতার বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য যে আকুলতা এতদিন বুকের গভীরে জমা করে রেখেছিলেন, অবশেষে রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তা উজাড় করে দিলেন তসলিমা।
আক্ষেপ আর ক্ষোভের সুর মিলিয়ে জানিয়ে দিলেন, এই শহর তাঁর মনের ভেতর সব সময় জীবন্ত ছিল, শুধু ফেরার পথটুকু বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
২০০৭ সালে তাঁর উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’কে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল কলকাতা। কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর লেখার জেরে পরিস্থিতি এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যে তা সামলাতে সেনা পর্যন্ত নামাতে হয় রাজ্য প্রশাসনকে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বামমনস্ক সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরামর্শ করে বইটিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং তসলিমাকে রাজ্য ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। ছাব্বিশে রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিজেপি সরকার গঠন করতেই নিশ্চিত হল লেখিকার কলকাতায় ফেরা।
রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তসলিমা শোনালেন সেই দীর্ঘ যন্ত্রণার কাহিনী। আগুনঝরা কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি কতবার মনে মনে প্রশ্ন করেছি কলকাতাকে, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হল? তবে আজ আমি উত্তর চাইতে আসিনি। আজ বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে, কিন্তু দুহাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আমি জানি চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।”
তৎকালীন বাম সরকারের ভূমিকা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিকে বিদ্ধ করে তিনি বলেন, “আজকের দরজা খোলা প্রমাণ করে অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে, কারা দরজা বন্ধ করেছিল আর কারা খুলল।”
রাজ্যে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ায় রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান লেখিকা। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন, এই কৃতজ্ঞতা কেবলই সৌহার্দ্যের, এর সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক আনুগত্যের সম্পর্ক নেই। মঞ্চে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও লেখিকাকে আশ্বস্ত করে জানান, “যতবার খুশি আপনি আসবেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।”
অভিমানের মেঘ আর দীর্ঘ নির্বাসনের যন্ত্রণা সরিয়ে নিজের প্রাণের শহরে আবার নিঃশ্বাস নিতে পেরে তসলিমার চোখে জল এলেও, তাঁর স্পষ্ট বার্তা বুঝিয়ে দিল— ইতিহাস তিনি ভুলে যাননি।

