ক্লাউড টিভি ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে আমেরিকা ও ইরান একটি বড় চুক্তির দিকে এগোচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি খসড়া (US Iran Deal 2026) সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে আলোচনা চলছে, যা বাস্তবায়িত হলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটতে পারে।
যদিও এখনও কোনও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, তবুও উভয় পক্ষই অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম আলোচিত বিষয় হল ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ তহবিল। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, জ্বালানি খাত পুনরুজ্জীবন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই বিশাল অর্থনৈতিক প্যাকেজের দাবি তুলেছে তেহরান। একইসঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থও ধাপে ধাপে মুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বিশেষ করে লেবাননে চলমান সংঘাত ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইস্যু সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আলোচনায় লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, লেবানন প্রশ্নে সমাধান না হলে বৃহত্তর শান্তি চুক্তি কার্যকর করা কঠিন হবে।
এছাড়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির (US Iran Deal 2026) মাধ্যমে হরমুজে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাক, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরে আসুক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মেনে চলুক। অন্যদিকে ইরান বলছে, পারমাণবিক বিষয়টি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ও অর্থনৈতিক সমঝোতার পরের ধাপে আলোচনা করা উচিত। এই মতপার্থক্য এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সতর্ক আশাবাদী অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, দুই দেশ "চুক্তির কাছাকাছি" পৌঁছেছে, তবে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাকি রয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও বলেছেন, একটি সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও মেলেনি।
অন্যদিকে ইরানও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা অগ্রগতিকে স্বীকার করলেও "চুক্তি একেবারে আসন্ন" এমন দাবি করতে রাজি নয়। তেহরানের বক্তব্য, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ইজরায়েলের অবস্থান এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধ এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি সফল হলে শুধু আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্কেই পরিবর্তন আসবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের গোটা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। তেলের বাজার স্থিতিশীল হতে পারে, আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়তে পারে। তবে চুক্তি ব্যর্থ হলে সংঘাত ফের তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, লেবানন সমাধান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার প্রচেষ্টা-এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সম্ভাব্য আমেরিকা-ইরান চুক্তি। এখন বিশ্বের নজর, এই "প্রায় চূড়ান্ত" সমঝোতা আদৌ বাস্তবে রূপ পায় কি না।

