কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা (TMC Leader of Opposition Row) পদকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন দলের অন্দরের বিভাজনকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে-তৃণমূল কংগ্রেস কি বড়সড় ভাঙনের মুখে?
তৃণমূলের একাংশ বিধায়ক দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদি তা বাস্তবে ঘটে, তাহলে তা সরাসরি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হবে। কারণ, তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যেই শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থার সূত্রপাত হয় তথাকথিত 'স্বাক্ষর বিতর্ক' বা 'সিগনেচার স্ক্যান্ডাল' থেকে। অভিযোগ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে যে চিঠি বিধানসভায় জমা দেওয়া হয়েছিল, তাতে কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরই পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। তাঁরা বিধানসভার স্পিকারের কাছে স্বাক্ষর জালিয়াতির (TMC Leader of Opposition Row) অভিযোগ জানান বলে দাবি করা হয়। এরপরই তৃণমূল নেতৃত্ব তাঁদের বিরুদ্ধে 'দলবিরোধী কার্যকলাপ'-এর অভিযোগ এনে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলীয় বিবৃতিতে বলা হয়, তাঁরা বারবার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অনুপস্থিত থেকেছেন এবং সংগঠনের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন।
কিন্তু বহিষ্কারের পরেও বিতর্ক থামেনি। বরং সূত্রের খবর, তৃণমূলের একাংশ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং সেই কারণেই ঋতব্রতের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে বিরোধী দলনেতা পদে সমর্থনের বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে দলের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে ডাকা তৃণমূল বিধায়ক দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক উপস্থিতির অভাবে বাতিল করতে হয়। সূত্র অনুযায়ী, ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনাও দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও দূরত্বের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ধাক্কার পর তৃণমূলের মধ্যে নেতৃত্ব, কৌশল এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিশা নিয়ে মতবিরোধ ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট সেই অসন্তোষকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যদিও দলীয় নেতৃত্ব প্রকাশ্যে কোনও ভাঙনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি রাজনৈতিক মহলে অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন নজর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলনেতা (TMC Leader of Opposition Row) হিসেবে কে স্বীকৃতি পান এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির কতটা শক্তি দেখাতে পারে, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে রাজ্যের আগামী রাজনৈতিক সমীকরণ।

