Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
ডেটলাইন: পর্ব ৫৫

ডেটলাইন: পর্ব ৫৫

Daak Bangla 0 months ago

ডাকাতিয়া বাঁশি

'আপনে কি সত্যই বাঙালি?' ঢাকায় যিনি একঘর লোকের মাঝে ঈষৎ বিরক্তিমাখানো এই প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন আমার দিকে, তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। সত্যিই তো, বাঙালি হয়ে ইলিশ মাছ পছন্দ না-করাটা অপরাধ, সে গঙ্গাপারেই হোক কি পদ্মাপারে। সে-রাতে পাঁচতারা ডিনারে ইলিশ ভাজা থেকে লেজা ভর্তা, সর্ষে ভাপা থেকে গোটা ইলিশ বেকড, এমনকী, অভিনব আনারস দিয়ে ইলিশ মাছের পদ পর্যন্ত ছিল।

যদিও দেখেছি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পুব বাংলার পেঁয়াজ দিয়ে ইলিশ রান্না খুব একটা ভালবাসে না, তবু আমি একটা টুকরো আনারস-ইলিশ চেখে দেখলাম। ইলিশপ্রেমী না হয়েও বুঝলাম, মাছটা অনবদ্য। তখনই গৃহকর্তা জোরদার আপ্যায়ন শুরু করলেন, আরও ইলিশ খেতে হবে। বাধ্য হয়ে বললাম, তত ভালবাসি না। মনে হল, ওর বুকে কেউ ছুরি মারল, এবং উনি আমার বাঙালিত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়লেন।

এহেন আমি যাব ইলিশ-রাজধানী চাঁদপুর, শুনলে উনি নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন। ভারতীয় উপমহাদেশের সেরা ইলিশ মেলে চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমে। সেখানে আমাদের ট্রাভেল শোয়ের শ্যুটিং। ব্যাপারটাকে আরও ইন্টারেস্টিং করার জন্য আমরা বেছেছি জলপথ। ঢাকা থেকে বরিশাল আর সেখান থেকে চাঁদপুর, পুরোটাই লঞ্চে।

ঢাকার সদরঘাট থেকে রাতভর লঞ্চে বরিশাল এক আশ্চর্য যাত্রা। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অলৌকিক জলযান' উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। দেশভাগ নিয়ে অসামান্য লেখা। দেখলাম নানা রকমের, নানা দামের লঞ্চ আছে, কোনওটা বেশ বিলাসবহুল, কোনওটা একদম আমজনতার। আমরা এমন একটা বাছলাম, যেটার দোতলায় কেবিন আছে আর একতলায় শশী থারুরের ভাষায় 'ক্যাটল ক্লাস'। এতে আমাদের শুটিং-এর সুবিধে হবে। একতলায় যাত্রীদের ইন্টারভিউ নেব, দোতলায় কেবিনে ক্যামেরা ইত্যাদি দামি সরঞ্জাম নিরাপদে রাখতে পারব। তাছাড়া ডেকে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা যাবে। মাঝারি দামের কেবিন ছোট হলেও বিছানাটা ভাল, টিভিও লাগানো আছে দেখলাম। রাত ন'টা নাগাদ বিশাল হেডলাইট জ্বেলে, ভোঁ বাজিয়ে বুড়িগঙ্গা দিয়ে রওনা হল লঞ্চ। আস্তে-আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল ঢাকার স্কাইলাইন। আশপাশে আরও লঞ্চ ছেড়েছে, গন্তব্য আলাদা। সদরঘাটে দাঁড়ালে এক-একসময় মনে হয় ঢাকার রাজপথের মতোই ট্রাফিক জলপথেও। নদীমাতৃক দেশের যাতায়াত অনেকটাই নৌকো-ফেরি-লঞ্চ নির্ভর। আকাশে যেমন নীলের মাঝখানে পথ চিনে চলে বিমান, অথৈ জলের বুকেও তেমনই ঠিক দিশায় জাহাজ চলে। যন্ত্র আর মানুষের যুগলবন্দি।

জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কেন ছাড়তে হয়েছিল বাংলাদেশের বাড়ি?
পড়ুন 'ডেটলাইন' পর্ব ৫৪…

বরিশালের কীর্তনখোলা নদী

ক্যালেন্ডার তো দেখিনি, কিন্তু মনে হল পূর্ণিমার আশপাশে হবে। নয়তো নদীর বুকে অমন ঝিলিমিলি জ্যোৎস্না এল কোথা থেকে? একটু দূর দিয়ে আরেকটা লঞ্চ গেলে ঢেউ ওঠে আর তার ধাক্কায় ভেঙে যায় আলোর প্যাটার্ন। সেখানকার যাত্রীরা আবার হাত নাড়ে এই লঞ্চের অজানা বন্ধুদের দিকে। এখান থেকেও উত্তর যায় হাত নেড়ে, সিটি বাজিয়ে। মনে হয়, ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকি সারারাত, দেখি জলের আর জীবনের চলাচল।

ভোরবেলা নামলাম বরিশালের লঞ্চঘাটে। বাংলাদেশে নদীর নামগুলো এত সুন্দর। বরিশালের নদী কীর্তনখোলা। জীবনানন্দ দাশের বরিশাল। ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম ছোট-বড় নদীর জাল পাতা সবুজ বরিশালে। আগেকার দিনে এখানকার মানুষ নৌকো করে এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত করত। হয়তো সেজন্যই তাঁর কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে নদী, জল, স্রোত। 'জলের আবেগে তুমি চলে যাও-জলের উচ্ছ্বাসে পিছে ধু ধু জল তোমারে যে ডাকে!' কিন্তু বরিশালে জীবনানন্দের বাড়ির খোঁজ করলে মুশকিল। সেই একুশ শতকের গোড়ায় তো ভ্লগারের দল ছিল না, তাহলে এত কাঠখড় পোড়াতে হত না।

 ঢাকা-বরিশাল লঞ্চ

এই বরিশাল শহরেই রয়েছে জীবনানন্দ দাশ সড়ক, যার আগে নাম ছিল বগুড়া রোড। তার ধারেই সর্বানন্দ ভবনে ১৯৪৬ সালে কলকাতা চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত থাকত জীবনানন্দের পরিবার। ঠাকুরদার নামে ছিল বাড়ির নাম। পরে মালিকানা বদল হলেও সেই বাড়ি পেল একেবারে জীবনানন্দীয় নাম ধানসিড়ি। এসব তথ্য জানা গেল বরিশালের বিখ্যাত ব্রজমোহন কলেজে গিয়ে। সেখানে নিজে তো পড়তেনই, দীর্ঘকাল ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন কবি। বরিশাল শহরে জীবনান্দের বাড়ির নামটি কাব্যিক হলেও হাল খারাপ। আসল চেহারা আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুনলাম, ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে ঝালোকাঠিতে মামাবাড়ির গ্রামটি বরং সুন্দর। সবচেয়ে বড় কথা, ঝালোকাঠিতেই আছে তাঁর ধানসিড়ি নদী 'আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়। হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে,'- চাইলেও ফিরে আসা যে সহজ নয়, বুঝেছি। সেবার সময়ের অভাবে ঝালোকাঠি না যাওয়ার আফসোস মেটাতে পারিনি আজও-'জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার।'

কেন যে বাঙালরা বলে, 'আইতে শাল, যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল'- কে জানে! এক বরিশালী অবশ্য দাবি করলেন, বানানটা তালব্য শ না হয়ে দন্ত্য স হবে, কারণ আগেকার দিনে ঢাকা যাতায়াতে প্রচুর সময় লাগত, অর্থাৎ সাল ঘুরে যেত, সেটা বোঝাতে এই প্রবাদ। অনেকে আবার তালব্য শ-এর পক্ষে, মানে বরিশাল জুড়ে এত নদীর কারণে যাতায়াত ঝামেলার। সে যা-ই হোক, এখানকার মানুষগুলো ভাল। বিকেলবেলা রিকশাওয়ালাকে বললাম, কী দেখার আছে এখানে, নিয়ে চলো। সে ভারি মুশকিলে পড়েছে মনে হল! মাথা চুলকে বলল, 'ট্রেড ফেয়ার যাইতে পারেন।' প্রবল আপত্তি করায় সোজা নিয়ে গেল কীর্তনখোলার ধারে। সত্যি ভারি সুন্দর সূর্যাস্তের নদী! বড় জাহাজ, লঞ্চ, ফেরি, ডিঙি নৌকো, যতরকম জলযান হয়, সব হয় নোঙর করা, নয়তো ভেসে যাচ্ছে। আমরা খুঁজে বের করলাম কাল ভোরে যে লঞ্চ আমাদের নিয়ে যাবে চাঁদপুর, সেটিকে। কমবয়সি নাবিকের সে কী আপ্যায়ন। ভারত থেকে গিয়েছি বরিশাল, তারপর আবার চাঁদপুর যাব, শুনে সে মুগ্ধ। জলের বুকে হালকা দুলুনির আরামে চা-বিস্কুট খেয়ে বিদায় নিলাম, আবার দেখা হবে আলো ফুটতে না ফুটতে।

 বরিশালে জীবনানন্দ দাশের পৈতৃক বাড়ি

শচীনকর্তার গানে 'ডাকাতিয়া বাঁশি' শুনেছি, কিন্তু নদীর নামও যে ডাকাতিয়া হতে পারে, চাঁদপুর না গেলে জানতাম না। এই নদীর ধারেই জুট মিলের গেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করেছেন ঢাকার এক হিতৈষী। সেখানকার অভিজ্ঞতার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দেব না তাঁর ওপর রাগ করব, এত বছরেও বুঝে উঠতে পারিনি। দুপুরে পৌঁছে জমিয়ে ইলিশ দিয়ে ভাত খেতে-খেতে ম্যানেজারের মুখে গল্প শুনলাম, এই নদী যখন আরও অনেক গভীর ছিল, তখন এখানে বড় জাহাজ আসত। লোককথার 'অনেক বছর' মানে ঠিক কতদিন কেউ বলতে পারে না, সেরকম অনেকদিন আগে একটা জাহাজডুবি হয়। জাহাজে অনেক দামি মালপত্র ছিল। যাত্রীদের সঙ্গে সেসবও তলিয়ে যায়। সেসময় তো বটেই, আজও নাকি জলের নিচে ডুব দিয়ে কেউ কেউ পেয়ে যায় বিলিতি জিনিসপত্র। তবে সেগুলো ঠিক কেমন, কেউ দেখেনি কখনও। এ তো টাইটানিকের বাংলাদেশি সংস্করণ!

জাহাজডুবির স্পটটা জেনে নিয়ে একবার যেতে হবে। ইচ্ছে প্রকাশ করতেই জোরগলায় বললেন ম্যানেজারবাবু, 'বিকালে নয়। কাল দিনের বেলা যাইবেন।' তারপর একটু ইতস্তত করে সাফাই গাওয়ার মতো বললেন, 'এমনি কিছু নয়, নিরিবিলি জায়গা তো, দুষ্টু লোক ঘোরে সারা সময়।' তখনও আমাদের মাথায় এই প্রশ্নটা আসেনি যে, নদীর ধারে গাছগাছালি-ঘেরা এই বিশাল কারখানা চত্বরে ব্রিটিশ আমলের বাংলোয় যে মাত্র দু'জন মানুষ থাকব রাতে, সঙ্গে দামি ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম, দুষ্টু লোকেরা খবর পাবে না? অতল জলে ডুব দিয়ে গুপ্তধন খোঁজার চেয়ে অনেক সহজ না কি ডাকাতিয়ার তীরে নির্জন বাংলোয় ডাকাতি করা?

আসলে দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামা পর্যন্ত এসব মাথাতেই আসবে না। আশপাশটা এত সুন্দর যে শুটিং-এর নেশাতেই বুঁদ হয়ে ছিলাম। বিকেল ছটার ভোঁ পড়ল জুট মিলে, আমরা গেট দিয়ে ঢুকতে-ঢুকতে দেখলাম, ছুটির পর দলে-দলে শ্রমিক গল্পগাছা করতে-করতে বেরিয়ে যাচ্ছে। ম্যানেজারের অফিসে ঢুকে চা খেতে-খেতেই টিফিন ক্যারিয়ারে রাতের রুটি-মাংস রেখে গেল একজন। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এত তাড়াতাড়ি? অম্লানবদনে ম্যানেজার জানালেন, 'রাতে তো এখানে কেউ থাকে না।' বলে উনি ব্যাগ কাঁধে উঠে দাঁড়ালেন। একজন অফিসে তালা লাগাল। একসঙ্গেই বেরোলাম, গেটের দিকেই আমাদের বাসস্থান। হাত নেড়ে বিদায় নেওয়ার সময় বললেন, 'ভিতরে যান। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকবেন না।' ঘরে ফেরা পাখির কাকলিতে ডুবে যাওয়া সেই কথার শেষে কি আরও কিছু ছিল? অস্বস্তিকর কিছু? নয়তো আমরা বাধ্য ছাত্রের মতো বাংলোর ভেতরে ঢুকে সদরে খিল দিলাম কেন?

কিছুক্ষণ কাটল কাজেকর্মে, মানে বরিশাল আর চাঁদপুরে এতক্ষণ তোলা ফুটেজ লগ করে। এত নিঃস্তব্ধ চারপাশ যে দম বন্ধ হয়ে আসে। মাঝে-মাঝে পাতার বা কোনও ছোটখাট প্রাণীর চলে যাওয়ার খসখস শব্দ।

  চাঁদপুরে জলের রূপালি শস্য।
ডাকাতিয়ার বুকে নৌকোয় গান ধরেছে বেদেনিরা

ভাবলাম, তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ি, কাল সকাল থেকে নদীর বুকে শুটিং। এদিকের লোক ঝাল বেশি খেলেও রান্নার হাত চমৎকার। খেয়ে উঠে আমার আর ক্যামেরাম্যানের কাজ হল গোটা বাংলো ঘুরে-ঘুরে সরেজমিনে দেখা, কোথাও দরজা, জানালা খোলা আছে কি না। বাথরুম তো নয়, হলঘর, তার আবার একটা দরজা বাইরের দিকে খোলে, সাফাই করতে আসার জন্য। এরকম গোটাচারেক বাথরুমের মরচে ধরা ছিটকিনি বন্ধ করতে আমাদের দু'জনের আধঘণ্টা লাগল। ভেবেছিলাম, এত ক্লান্ত, শুলেই ঘুম এসে যাবে। তার উপায় নেই। কীসের যে সব অদ্ভুত আওয়াজ কানে আসতে লাগল। মানুষ না না-মানুষ, কে জানে! দুষ্ট লোক না ডোবা জাহাজের অতৃপ্ত নাবিক, কার বেশি আগ্রহ থাকতে পারে বিদেশি অতিথিদের প্রতি, ভাবতে-ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি!

জুট মিলে প্রথম শিফটের ভোঁ বাজার আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। ভোরের হালকা কুয়াশা গায়ে মেখে মজদুরের দল ঢুকছে রোজকার রুটিনে, তাদের হঠাৎ খুব আপন মনে হল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এই যে চারপাশে হাঁকডাক, এই ভরসাতেই মানুষ বাঁচে।

নৌকো ভাড়া করেছি। একদম দিশি ডিঙি নৌকো, কারণ এতে শুটিং ভাল হয়। যাব পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার সঙ্গমে। একেবারে শেষ বিন্দুতে অবশ্য যাওয়া বারণ। সেখানে নাকি প্রবল ঘূর্ণি, বারমুডা ট্যাঙ্গলের মতো। নৌকো তো কোন ছার, বড় লঞ্চও টেনে নেবে, সাবধান করল মাঝিভাই। যত মোহনার দিকে এগচ্ছি, তত চওড়া হচ্ছে নদী। একটু আগে পাড়ে দেখেছি মাছের আড়তে ওজন হচ্ছে জলের রূপোলি শস্য। আর ক'দিন পরেই ইলিশ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা লাগু হয়ে যাবে। সকাল দশটার রোদ অসংখ্য চুমকি হয়ে ফুটছে জলে। ছোটবেলায় বিশ্বাস করতাম, ওগুলো জলপরিদের মাথার মুকুট। ওদের দেখা যায় না, জলের নিচে থাকে কি না! যেখানে গিয়ে নৌকো দাঁড়াল, সেখানে চরাচর দেখা যায় না। শুধু জল আর জল। তিন নদীর জলের ঘোলাটে, গেরুয়া আর কালচে রং স্পষ্ট আলাদা করা যায়। আশপাশে আর নৌকো নেই। রোদে ঝলমল করছে বিশাল জলরাশি, চোখে কেমন ধাঁধা লেগে যায়। প্রাণ ভরে ছবি তোলার পর ফিরতে লাগলাম। এবার একটু বাঁ-দিক ঘেঁষে। কিছুক্ষণ পর এক আশ্চর্য দৃশ্য চোখে পড়ল। একেই কি বলে জলের জীবন? সার দিয়ে দাঁড়ানো নৌকোগুলোতেই মানুষের ঘর গৃহস্থালি। দাদু-নাতনিকে নিয়ে নৌকো বেয়ে চলেছে কুটুমের নৌকোর দিকে। নৌকোর পাটাতনে বসে নদী থেকে জল তুলে শিশুকে স্নান করাচ্ছে মা। অন্যদিকে উনুনে রান্না চেপেছে। মাঝি বলল, 'বাইদ্দার দল।' মানে বেদে। যাযাবরের জীবন এদের, জলের বুকে। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে নানা বয়সের একদল মহিলা গলা ছেড়ে গান গাইছে দেখে মজা লাগল। ক্যামেরা তাক করতেই হইহই করে জনাচারেক সাঁতরে চলে এল আমাদের নৌকোর কাছে। জিজ্ঞেস করলাম, 'নৌকোয় বসে গাইবে?' হেসে গড়িয়ে পড়ল জলের মধ্যেই। উঠে এল নৌকোয়। মাঝিভাই হাঁ-হাঁ করে ওঠার আগেই হাতের কাছে হাঁড়ি-কড়াই যা পেল তুলে নিয়ে বাজিয়ে গান ধরল, 'বাড়ির পাশে তিতাস নদী, উতল হাওয়া বয় রে। পরাণবন্ধু শ্যাম কালাইয়া মরণ বাঁশি বাজায় রে।' এরকম কিছু একটা ছিল গানের কথা, আজ আর ভাল মনে নেই। গান শেষ হতেই টাকা নিয়ে ঝটপট নেমে গেল জলের মধ্যে, যেন বাস থেকে নামল স্টপে।

ওরা নামতেই ফেটে পড়ল মাঝিভাই। 'আপনেদের হুঁশ নাই। বাইদ্দারা চোর। গায়ে সাপ ছাইড়্যা দিয়া লুট করে নাই চোদ্দ গুষ্টির ভাইগ্য।' মনে-মনে হাসলাম, ডাকাতিয়ার বুকে এমন করে ডাকাতিয়া বাঁশি শোনাত বেদের মেয়ে ছাড়া আর কে?

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla