Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৩

মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৩

Daak Bangla 1 month ago

ভোলামন

'কেমন আছিইইইস? কত্ত দিন পরে দেখা! তুই কিন্তু একই রকম আছিস, খালি একটু মুটিয়েছিস! এদিকেই থাকিস বুঝি? উফফফ! কী যে আনন্দ হচ্ছে তোকে দেখে কী বলব! অ্যাই, কী রে, তখন থেকে তো আমিই বকবক করছি, তুই তো কিছু বলছিসই না!' আমি তার দিকে বোধহয় শূন্য দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকার জন্যই, সে একটু থমকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমায় জিজ্ঞেস করে, 'আচ্ছা, আমি কে বল তো?'

ব্যস, এই অমোঘ প্রশ্নটার মুখোমুখি হতেই আমি চাইছিলাম না। কারণ এতক্ষণ আমি ৩৩৩ কোটি দেবতার পায়ে পড়ে, আমার ব্রেনের সব দিকের ঘিলু নাড়িয়ে অ্যাক্টিভেট করার চেষ্টা করছিলাম শুধু এটুকু মনে করতে, আমার সামনে অতিমাত্রায় উচ্ছ্বসিত এই মহিলা কে, তার নাম কী, সে আমার সঙ্গে কী সূত্রে পরিচিত, আমার তার সঙ্গে ঠিক কেমন হৃদ্যতা ছিল… কিচ্ছু না, কিছুই মনে পড়ছে না। কেন যে আমি সাদা বোর্ডের মতো বড় মাথাটা ঘাড়ের ওপর বসিয়ে কেবল শো-পিসের মতো বয়ে বেড়াচ্ছি, তার কোনও সদুত্তর পাচ্ছি না। মালুম হচ্ছে, আমার গ্রে-হোয়াইট-ব্ল্যাক সবরকম ম্যাটার লম্বা ছুটিতে চলে গেছে এবং তাদের যোগাযোগ করতে চাইলে একটাই গৎ বাজছে: 'আপনি যার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছেন, তিনি এখন নেটওয়ার্ক সীমার বাইরে।' অগত্যা আমার কাজ একটাই: সদ্য নির্বাণ লাভ করেছি এমন মুখ করে, সম্পূর্ণ ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।

মাঝবয়সে মেয়েদের সহ্য করার ফিল্টার কমে যায়! পড়ুন 'মেঘে মেঘে বেলা' পর্ব ৩…

পরবর্তী স্টেপে, সে খানিক অভিমান করে বলল, 'চিনতে পারিসনি তো?' আমি হেঁ-হেঁ করে একটি কান এঁটো করা হাসি হেসে প্রমাণ করতে চাইলাম, আমার সবই মনে আছে, কেবল নামটাই মনে নেই। তারপর সে একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে নামটি বলল। তখন আমি জলোচ্ছ্বাসের ঢঙে এমন হাবভাব করতে আরম্ভ করলাম, যেন তার চেয়ে আপন আমার কেউ নেই এবং কেউ ছিল না। তার সঙ্গে সম্পূর্ণ জেনেরিক কথাবার্তা বলে চলে আসার পরেও মনে করতে পারলাম না, সে কে? স্কুলের বন্ধু? কলেজের শত্রু? ইউনিভার্সিটি-তুতো বোন? সে জিন্দেগির কোন সফরে আমার সঙ্গে ছিল! পুরো ব্ল্যাঙ্ক। অতঃপর আমার ব্রেনের অক্ষমতাকে ক্ষমা না করে গজগজ করে বাড়ি ফিরলাম।

এই অস্বস্তিকর, লজ্জাজনক পরিস্থিতি এখন আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। সব ভুলে যাই। এবং তা স্বীকার করতে কোনও বাধা নেই। আর বাধা থেকে হবেই বা কী! কারণ স্মৃতির বাধা আমি কিছুতেই পেরোতে পারছি না। ভুলে যাওয়া ব্যাপারটাকে আমি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমার জীবনে সব জিনিসের- অর্থাৎ কিনা নানা রকম কাজের, লোকজনের, বস্তুর একটিই ডাকনাম আছে। তা হল 'ইয়ে'। ইয়ে মানে জেলুসিল, ইয়ে মানে চশমা, ইয়ে মানে মোবাইল, ইয়ে মানে ছোটকাকা, ইয়ে মানে ওসামা বিন লাদেন কিংবা বারাক ওবামা, ইয়ে মানে ঝাঁটা কিংবা ল্যাপটপ। সেদিক থেকে জীবন (বা বাক্যগঠন) খুবই জটিলতাহীন। কিন্তু সমস্তটা তো এভাবে ম্যানেজ করা যায় না। তাই নেটব্যাঙ্কিং-এর পাসওয়ার্ড ভুলি, পুরনো প্রতিবেশীর নাম ও মুখ, দিদিকে 'পরশু সন্ধেবেলা যাচ্ছি' বলে সেই সময়টা বাড়িতে গ্যাঁট হয়ে চানাচুর খাই, কাজের মাসিকে সকালে আলুপটলের তরকারি করতে বলে, দুপুরে ভয়ঙ্কর চেঁচামেচি করি: কেন আলু-ফুলকপি হয়নি। ব্যাঙ্কের পাসওয়ার্ড উদ্ধার হলেও, লকারের চাবি উদ্ধার করতে পারিনি। ফলে এমন হতেই পারে, আমার সাধের সব গয়না আমার ভুলে যাওয়ার দরুণ তামাদি হয়ে গেল।

ফ্রিজ খুলে দাঁড়িয়ে থাকি, কারণ প্রাণপণ মগজ হাতড়েও মনে পড়ে না, এক সেকেন্ড আগে কেন ফ্রিজ খুলেছিলাম। আলমারির ক্ষেত্রেও তা-ই। ডাল-দুধ-ভাত-তরকারি-মাংস, সব পদেরই আমরা মাঝে মধ্যেই তীব্র স্মোকড রেসিপি খাই। ওষুধ খেতে অহরহ ভুলে যাই। এবং যাদের দায়িত্ব আমার ওপর, তাদেরও মাঝে মধ্যে ওষুধ দিতে ভুলে যাই। তারপর অপরাধবোধে ভুগি। কত জরুরি মিটিং মিস করেছি সে আর নিজের মুখে কী বলব! এবং নিজের প্রতি এ ব্যাপারে আমার অগাধ বিশ্বাস যে আমি এমনটা করতেই থাকব। অন্য কোনও ব্যাপারে আমার ডিসিপ্লিন থাকুক বা না থাকুক, এ ব্যাপারে ধারাবাহিকতায় কোনও ছেদ পড়ে না। মাঝে মাঝে ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে এ হেন ভুলো মনের জন্য।

এমন নয় যে শোধরানোর চেষ্টা করিনি। ফোনে রিমাইন্ডার, টু-ডু-লিস্ট তৈরি করা- সব করেছি। একটি শব্দ লিখে রিমাইন্ডার সেট করেছিলাম, কিন্তু ফোন যখন বিভিন্ন মিউজিক দিয়ে আমার সামনে শব্দটি উপস্থাপন করছে, আমার এতটুকু মনে পড়ছে না, এটার মানে কী, নিজেকে আমি কী মনে করাতে চাইছি। ফলে সে-ও জলে গেল। আমার বাড়ির একজন শুভানুধ্যায়ী বার বার বলে, 'লিখে রাখো, লিখে রাখো। কাগজ-পেনে লিখলে মনে থাকে।' লিখেও রাখি। কিন্তু লেখার পর সুদৃশ্য ডায়েরিটা কোথায় রাখি সেটা বিলকুল মনে রাখতে পারি না। সবচেয়ে দুঃখের কথা: যার ঘাড়ে আজীবনের জন্য উঠে পড়েছি, তার ক্রেডিট কার্ড দিনের পর দিন আমার ব্যাগে থাকে, কিন্তু আমি সোয়াইপ করে টাকা নয়ছয় করতে ভুলে যাই। তাই আমার নিজের প্রতি পূর্ণ ধিক্কার জন্ম নিয়েছে।

আমার আত্মীয়-পরিজন আমার এই রূপান্তর দেখে মাঝে-মাঝে যখন অবাক হয়ে যায়, আমি তৎক্ষণাৎ কোভিডকে দায়ী করি। কোভিড ব্যাটাই আমার মাথার ঘিলুকে কিলাইকে কাঁঠাল পাকাইয়া দিয়া। কিন্তু এ-ব্যাপারে অভিজ্ঞ বয়স্ক মহিলারা অন্য এক ভিলেনকে দোষ দিচ্ছেন। সে হল: মাঝবয়স। তাঁরা বলছেন, এর থাবা কেউ এড়াতে পারে না। এই সময়েই ব্রেনে নাকি আসল ঝিলমিল লাগে। অবাধ্য বাচ্চার মতো দিশাহীন ব্রেন-ম্যাটার বিভিন্ন দিকে ছুটে বেড়ায়। আর ধরতে গেলেই পিছলে যায়। আমি মেনে নিয়েছি। মাঝবয়সের খোঁটা দিয়েই ছোটরা, মানে যারা বেড়ার ওপারে রয়েছে, তারা বলছে, টেক কেয়ার অফ ইয়োরসেল্ফ। এ সব মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিশিয়েন্সি থেকে হয়। সেই কথাও শিরোধার্য করে পিরিয়ডিক টেবিলে যতরকম মিনারেল আছে, সেইসব সম্বলিত সাপ্লিমেন্ট খেয়েও আমার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। বরং আমার মেজাজ রেডিও-অ্যাকটিভ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফেসবুক রিল সম্বলিত ডাক্তার-টাইপের স্বজনরা বলছে, ঠিকমতো ঘুম না হলে এমন হয়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। সারাদিন অসহ্য সমস্ত পরিস্থিতি, রাত দশটায় ছেলের প্রজেক্ট করতে বসার মতো বিভিন্ন ইমার্জেন্সি, নিজের খিটখিটে মেজাজ পেরিয়ে রাতে কিছুক্ষণের জন্য নেটফ্লিক্স দেখা আমি ছাড়তে পারিনি। এবং এ জন্য আমি লজ্জিত নই। বেশ বড় বয়স অবধি আমায় কোনও অনিয়ম করতে দেওয়া হত না। এখন তার প্রতিশোধ নিচ্ছি। আমি মনে করি, এটা আমার মাঝবয়সের মৌলিক অধিকার। এবং যারা বলছে এই স্মৃতি-ঝঞ্ঝাট স্ট্রেস থেকে হচ্ছে, তাদেরও আমি দোষ দিতে পারছি না। কারণ বেশিরভাগ সময়ে তারাই আমার স্ট্রেসের কারণ।

আমার আত্মীয়-পরিজন আমার এই রূপান্তর দেখে মাঝে-মাঝে যখন অবাক হয়ে যায়, আমি তৎক্ষণাৎ কোভিডকে দায়ী করি। কোভিড ব্যাটাই আমার মাথার ঘিলুকে কিলাইকে কাঁঠাল পাকাইয়া দিয়া। কিন্তু এ-ব্যাপারে অভিজ্ঞ বয়স্ক মহিলারা অন্য এক ভিলেনকে দোষ দিচ্ছেন। সে হল: মাঝবয়স। তাঁরা বলছেন, এর থাবা কেউ এড়াতে পারে না।

অবশ্য, আমার নিজের একটা মত আছে। তা হল: এটা অসুখ নয়, একটা সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি, টিকে থাকার কৌশল। আমার ব্রেন, এই বয়সে পৌঁছে, আর আজেবাজে জিনিস মনে রাখতে চাইছে না। সে জানে, আলমারির চাবি জরুরি নয়, ফেলে আসা কলেজ-প্রেমের একটা বিকেলের স্মৃতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের পাসওয়ার্ডের বদলে আমার নিখুঁত মনে আছে কিশোরী-ইস্কুলের নাচের বোল এবং সেটা শেখানোর সময় মাস্টারমশাইয়ের অ্যাক্কেবারে নির্দিষ্ট অভিব্যক্তি। আমার ব্রেন বোধহয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যথেষ্ট হাবিজাবি ব্যাপার নিয়ে হইহই হয়েছে, এবার আমি বেশ কিছু স্মৃতি বাতিল করব, ঝেঁটিয়ে দূর করব। এই হেড-গৃহস্থ গোছের ভারিক্কি দায়িত্ব তাকে কে দিল কে জানে, কিন্তু এলোপাথাড়ি জিনিস ফেলে দিয়ে ঘরদোর তকতকে রাখার নেশা সাংঘাতিক। আবার এও হতে পারে, এই ইনফর্মেশন-বিস্ফোরণের যুগে, আমার মগজ আর পেরে উঠছে না, সে হাল ছেড়ে দিয়েছে। ছেলের বন্ধুর পৈতের দিনও মনে রাখতে হবে, ওয়েব সিরিজের আগের এপিসোডের শেষটাও, ইরান ট্রাম্পকে কোন শর্ত দিয়েছে, আবার ঝাড়গ্রাম থেকে কে দাঁড়িয়েছিল এবং ক'ভোটে হেরেছে, তাও- এ তার পক্ষে বড্ড কঠিন পরীক্ষা। আরে, এত সাড়ে-বত্রিশভাজা মার্কা তথ্য স্টোর করবে কী করে, গিগাবাইট তো সীমিত। টেরাবাইট আপলোড করার মতো সিস্টেম নেই। পুরনো জেনারেশন। অতএব যা আছে, তা-ই দিয়ে চালাতে হবে। সুতরাং সময়ে সময়ে রি-ফর্ম্যাট চলতেই থাকবে। চলুক। শুধু আপনাদের কারও যদি আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, প্লিজ জিজ্ঞেস করবেন না, আপনি কে।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla