Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
নীলা-নীলাব্জ: পর্ব ২৫

নীলা-নীলাব্জ: পর্ব ২৫

Daak Bangla 1 month ago

মুহূর্তর আর্কাইভ

বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গঙ্গার ঘাটে বসে আছে নীলা। ঘোলাটে নদীর জলের উপর ভেসে আছে লালচে আলো। বেশ কিছু স্টিমার, সশব্দে যাতায়াত করছে। বাতাসে ভেজা-ভেজা ভাব। সূর্যটা নামতে শুরু করেছে। আকাশে নানা রঙের আনাগোনা লক্ষ করা যায়।

নীলা ফোনটা হাতে নিয়ে একাধিক ছবি তুলে চলেছে।

একবার আকাশ, একবার নদী, একবার সূর্যটা একটু ডানদিকে রেখে, তারপর একটু বাঁয়ে রেখে। কোনওটাই যেন পছন্দ হচ্ছে না।

ঠিক তখন পেছন থেকে সেই পরিচিত গলা- কী ব্যাপার? সূর্যটা পালিয়ে যাচ্ছে নাকি?

নীলা ঘুরে তাকায়- এসে গেছ দেখছি। (আবার ছবি তোলায় মন দেয়) ধরে রাখতে হবে তো। এই আলোটা দেখছ? দারুণ লাগছে না?

নীলাব্জ: হ্যাঁ, সূর্যাস্ত দেখতে আমার খুবই ভাল লাগে। কিন্তু তুমি এটা কী করছ? মোবাইল ফোনে সূর্যাস্ত দেখছ কেন? খালি চোখে দেখতে পাচ্ছ না?

এ আই কি মানুষের চেয়ে বিশ্বস্ত?পড়ুন: নীলা-নীলাব্জ পর্ব ২৪…

নীলা: আরে বাবা, কেন পাব না? কিন্তু এই স্মৃতিটা একটু রেখে দিতে চাই।

নীলাব্জ নদীর দিকে তাকায়- রেখে দেবে মানে? ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করবে?

নীলা রেগে যায়- ছবি তুলে রেখে দিচ্ছি। পরে দেখব। মনে পড়বে। এই মুহূর্তটা আমার এত ভাল লেগেছে যে, হারাতে চাই না।

নীলাব্জ হালকা হেসে পাশে বসে।

নীলাব্জ: তাহলে এতগুলো ছবি তুলছ কেন? একটা তুললেই তো যথেষ্ট, তাই না?

নীলা: একটু এদিক-ওদিক করে তুলছি। কোনটা ভাল হয় কে জানে।

নীলাব্জ: সেটা বুঝবে কী করে? তুমি কি ফটোগ্রাফার?

নীলা ফোনটা নামিয়ে তাকায়।

নীলা: তোমার সমস্যাটা কী বলো তো? মানুষ ছবি তুলছে, তাতেও সমস্যা?

নীলাব্জ: সমস্যা নেই। কিন্তু একটা জিনিস ভাবছিলাম।

নীলা: কী?

নীলাব্জ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে- কিছু বছর আগে, একটা বারো দিনের ভ্রমণ থেকে ফিরে মানুষ অ্যালবামে দশটা ছবি রাখত। এখন একই জায়গা থেকে ফিরে, এক সন্ধের কিংবা এক বিকেলের হাজারটা ছবি ফোনে থেকে যায়।

নীলা: তো? তার কিছু বছর আগে তো মানুষ ছবি তুলতেই জানতো না।

ছবি: এ আই নির্মিত

নীলাব্জ- সে কথা আমি বলছি না। আমি বলছি মজার ব্যাপার হল, আগের ওই দশটা ছবি মানুষ বারবার দেখত। আর এখন এই হাজারটা ছবি আছে, কিন্তু কেউ আর সেগুলো দেখেও না।

নীলা একটু থামে।

নীলা: এখন মানুষ ব্যস্ত। সময় কোথায়?

নীলাব্জ: না। সমস্যা সময় না।

সে একটু থামে।

নীলাব্জ: সমস্যাটা হল সংখ্যা।

নীলা ভুরু কুঁচকে তাকায়।

নীলা: মানে?

নীলাব্জ: যখন একটা জিনিস কম থাকে, তখন মানুষ তাকে যত্ন করে।
যখন হাজারটা থাকে, তখন একটা হারালেও কেয়ার করে না।

নীলা হেসে ফেলে- আমাদের দেশের জনসংখ্যার মতো?

নীলাব্জ: একদম ঠিক! একটা মানুষ মরলে আর-একটা আসবে। এখানে তো প্রাণের দাম নেই।

নীলা: বাহ! তাহলে গান-সিনেমা-বই- সবই তো এখন হাজার-হাজার পাওয়া যায়। সেগুলোরও মূল্য নেই?

নীলাব্জ: কমে গেছে তো। অধিক উৎপাদন, কিন্তু এদিকে মানের কোনও গ্যারান্টি নেই।

নীলা: ধুর! এটা তোমাদের পুরনো লোকেদের রোগ। আগে জিনিস কম ছিল বলে, মানুষ ভাবছে খুব মূল্যবান ছিল।

নীলাব্জ: কম থাকার জন্য না। কষ্ট করে পেতে হত বলে। কষ্ট করে কিছু না পেলে, তুমি তাকে সম্মান করতে পারবে না।

নীলা এবার একটু গম্ভীর।

নীলা: তুমি তর্কটাকে অন্যদিকে ঘোরাতে যেও না। কষ্ট করে পেতে হত মানেটা কী? সবাই সবকিছু পেত?

নীলাব্জ চুপ করে থাকে।

নীলা: আগে কি ক্যামেরা সবার কাছে ছিল? টিভি, রেকর্ড-প্লেয়ার কার কাছে ছিল? বই কেনার ক্ষমতা ক'জনের ছিল? এগুলো শুধু একটা শ্রেণির কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল। গরিবরা ভাবতেও পারেনি যে, তারাও একদিন ছবি তুলে আনন্দ পেতে পারে। টেকনোলজি সেটা করে দিয়েছে।

 ছবি: এ আই নির্মিত

নীলাব্জ কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকে যায়।

নীলা: কী বলতে যাচ্ছিলে?

নীলাব্জ: না না, থাক। প্রসঙ্গ ঘুরে যাবে…

নীলা: না, না, বলেই ফেল…

নীলাব্জ: আমি বলছিলাম, ছাগলেও তো কোনওদিন ভাবেনি, সে ছবি তুলবে কিন্তু মার্কেট যদি তার মনে ইচ্ছে জাগাতে পারে, আর বুঝতে পারে- এ আমার ভবিষ্যৎ গ্রাহক, তাহলে ছাগলও একদিন ছবি তুলবে।

নীলা রেগে যায়- গরিব মানুষকে ছাগল বলছ?

নীলাব্জ: এ-জন্যই বলতে চাইনি। ভুল বুঝো না। সবার তো সব কিছু করার কথা ছিল না। সবাই সবকিছু করতে গিয়েই তো জিনিসের মূল্য দিয়েছে কমিয়ে।

সে নদীর দিকে তাকায়। সূর্যটা প্রায় ডুবে এসেছে। চারিদিকে আলো জ্বলে উঠছে।

নীলা: এখন বেশি মানুষ ছবি তুলতে পারছে, গান শুনতে পারছে, সিনেমা দেখতে পারছে। মোবাইল ফোনেই পারছে। মূল্য কমলে কমুক, অধিকার তো বেড়েছে। ছবি দেখে নস্টালজিয়া-নস্টালজিয়া খেলবে শুধু এক শ্রেণির মানুষ? বাকিদের নস্টালজিয়ার কোনও দাম নেই?

নীলাব্জ মাথা নাড়ে- ঠিক কথা।

তারপর ধীরে বলে- কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করেছ?

নীলা: কী?

নীলাব্জ: যখন খুব বেশি জিনিস সামনে থাকে, তখন মানুষ কিছুই গভীরভাবে নেয় না।

নীলা: সেটা মানুষের দোষ। জিনিসের না।

নীলাব্জ: হতে পারে।

সে চারপাশে তাকায়। ঘাটে কয়েকজন দাঁড়িয়ে একই সূর্যাস্তের দিকে ফোন উঁচিয়ে ছবি তুলছে।

নীলাব্জ: জানো, আসল সমস্যাটা কোথায়?

নীলা: কোথায়?

নীলাব্জ: আগে একটা ছবি তুললে, সিদ্ধান্ত নিতে হত। এইটাই রাখব, নাকি আরেকটা তুলব। এখন আর সিদ্ধান্তের দরকার নেই। তুলতে তো খরচা হচ্ছে না।

নীলা: সেটা তো ভাল। বেশি অপশন।

নীলাব্জ মাথা নাড়ে।

নীলাব্জ: বেশি অপশন মানেই ভাল না।

নীলা: কেন?

নীলাব্জ: কারণ অপশন যত বাড়ে, মানুষ তত ঘেঁটে যায়। নিয়ে রাখি কুড়িটা ছবি, পরে দেখব, তারপর এই পরে-টা আর আসে না। যাদের অতিরিক্ত টাকা, আর জানে না টাকা নিয়ে কী করা উচিত, তারা তো ক্লাউড, ড্রাইভ কিনে নিজেদের তোলা ফালতু ছবি আপলোড করে রাখছে। ভবিষ্যৎপ্রজন্ম যদি কোনওদিন আমাদের এই সময়কার মানুষকে নিয়ে স্টাডি করে, দেখবে কী অনাবশ্যক স্মৃতির ভাণ্ডার তৈরি করে রেখেছি আমরা।

নীলা: কীসব বলছ?

নীলাব্জ: তুমি এখন এই সূর্যাস্তের ৫০টা ছবি তুলতে পারো।
তাই তুমি একটা নিয়েও ভাবছ না।

সে একটু থামে।

নীলাব্জ: আগে যদি একটা রোল থাকত, আর তাতে বারোটা ফ্রেম, তাহলে তুমি এই আলোটা দেখে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে ভাবতে।

নীলা চুপ করে থাকে।

নীলাব্জ: অভাব মানুষকে মনোযোগী করে। আর প্রাচুর্য মানুষকে করে উদাসীন।

নীলা এবার একটু বিরক্ত হয়।

নীলা: তোমার কথা শুনলে মনে হচ্ছে, মানুষ কিছুই করবে না। ছবি তুলবে না, গান শুনবে না, সিনেমা দেখবে না।

নীলাব্জ: না, তা বলছি না।

সে নদীর দিকে তাকায়।

নীলাব্জ: আমি বলছি, আমরা এখন সবকিছু অহেতুক জমাচ্ছি। হোর্ড করছি। ছবি জমাচ্ছি। আমার কাছে ৩০ জিবি ছবি আছে কিন্তু মনে তেমন কিছুই নেই! গান জমা করি। উফ! আমার কাছে ১০ টিবি গান আছে কিন্তু শুনি সেই ঘুরিয়ে ফিরয়ে পাঁচটা মতো! আমার কাছে এ আর রহমানের শো-র পনেরোটা ভিডিও আছে। গেছিলাম কনসার্ট দেখতে, মোবাইল ফোনে কিছু গান, বাজে ভিডিও কোয়ালিটি, বাজে অডিও কোয়ালিটিতে রেকর্ড করে আনলাম। এই আমাদের আজকের কালচার। আমরা বাঁচতে ভুলে গেছি নীলা। আমরা একটা ঢপের, একটা অদরকারি লাইব্রেরি বানাচ্ছি।

অপশন যত বাড়ে, মানুষ তত ঘেঁটে যায়। নিয়ে রাখি কুড়িটা ছবি, পরে দেখব, তারপর এই পরে-টা আর আসে না। যাদের অতিরিক্ত টাকা, আর জানে না টাকা নিয়ে কী করা উচিত, তারা তো ক্লাউড, ড্রাইভ কিনে নিজেদের তোলা ফালতু ছবি আপলোড করে রাখছে। ভবিষ্যৎপ্রজন্ম যদি কোনওদিন আমাদের এই সময়কার মানুষকে নিয়ে স্টাডি করে, দেখবে কী অনাবশ্যক স্মৃতির ভাণ্ডার তৈরি করে রেখেছি আমরা।

নীলা তাকিয়ে থাকে।

নীলাব্জ: ঢপের আর্কাইভ অফ লাইফ।

নীলা একটু ধীরে বলে- মানুষ চিরদিন স্মৃতি ধরে রাখতে পছন্দ করে। ওটাকে আর্কাইভ বলছ কেন?

নীলাব্জ: কারণ অনেক সময়ে স্মৃতি রাখার নামে আমরা মুহূর্তটাকে মেরে ফেলি।

নীলা অন্ধকারে তাকায়। সূর্য অনেকক্ষণ আগেই ডুবেছে।

নীলাব্জ: তুমি এখন সূর্যাস্ত দেখছ না। তুমি সূর্যাস্তের ফাইল কিংবা ফোল্ডার বানাচ্ছ। যা তুমি আগামীতে কোনওদিন খুলেও দেখবে না।

নীলা: জানো কেন মানুষ এত ছবি তোলে?

নীলাব্জ : কেন?

নীলা: কারণ জিনিসগুলো থাকে না।

নীলা শান্ত গলায় বলে - এই আলোটা পাঁচ মিনিট পরে থাকবে না। এই সন্ধেটা থাকবে না। এই সময়টা থাকবে না। মানুষ ভয় পায়, সব হারিয়ে যাবে। তাই একটু ধরে রাখতে চায়। কতটা ধরবে বুঝতে পারে না। মানুষ কি সমুদ্র সৈকতে ঝিনুক কোড়ায় না?

নীলাব্জ হালকা হাসে।

নীলাব্জ: মানুষের যা জমানোর প্রবণতা! পারলে হয়ত তিন কিলো ঝিনুক নিয়ে বাড়ি ফিরত।

নীলা হাসে।

নীলাব্জ : এখানেই তো একটা সমস্যা আছে নীলা।

নীলা: কী?

নীলাব্জ: যত বেশি ধরে রাখতে চাইবে,তত কম তুমি বাঁচবে। যে-মেয়েটাকে বইমেলায় একবার দেখেছিলে, তারপর আর কোথাও খুঁজে পাওনি, সেটাই তো আসল বেঁচে থাকা। যে গানটা তুমি রেডিওতে একদিন শুনে কেঁদে ফেলেছিলে, কিন্তু কোনোদিন জানতে পারনি ওটা কোন গান, সেটার মূল্য, বাকি চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা মিলিয়ন-মিলিয়ন ভিউ পাওয়া গানের চেয়ে অনেক বেশি। ছবি তোলার প্রয়োজন নেই নীলা। তুমি প্রাণভরে দেখো সূর্যাস্ত। পরে এই ছবি তুমি খুলেও দেখবে না। মুহূর্তটা ধরতে গিয়ে আসলে হারিয়ে ফেলছ।

নীলা: তুমি বুঝবে না। আমার ভাল লাগে ছবি তুলে রাখতে। আমার অনেক কিছু মনে পড়ে যায় পুরনো ছবিগুলো বা ভিডিওগুলো দেখলে।

নীলাব্জ : তার জন্য ক'টা ছবি লাগে?

নীলা: ক'টা লাগে কে বলে দেবে? তুমি? তোমার কথা আমি কেন শুনব? আমার যদি একশোটা লাগে তাহলে একশোটা। তোমার একটা হলে একটা। ঠিক ভুল তো নেই।

দু'জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। নীলা ফোনটা হাতে নিয়ে গ্যালারি খুলে একটার পর একটা ছবি দেখতে থাকে।নীলাব্জও উঁকি মারে।

নীলা: কী হতে চাও? আমার জীবনের সম্পাদক? আমার মুহূর্তের এডিটর?

নীলাব্জ হাসে- সে আর হতে দিচ্ছে কে?

ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla