Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
নীলা-নীলাব্জ: পর্ব  ২৭

নীলা-নীলাব্জ: পর্ব ২৭

Daak Bangla 3 hrs ago

দায়ভার

কালবেলা। নীলা নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মুখ গোমড়া। হাতে একটা ঝাঁটা। বারান্দা জুড়ে সদ্য লাগানো পায়রা-প্রতিরোধী জাল। আর সেই জালের ভেতরেই দিব্যি হাঁটাহাঁটি করছে একটা মোটকু ধূসর পায়রা। মাঝে-মাঝে গলা ফুলিয়ে বক-বকুম শব্দ করছে।
নীলা ঝাঁটাটা উঁচু করে- আজ তোকে মেরেই ফেলব!
পায়রাটা নির্বিকার।

ঠিক তখনই, সামনের বাড়ির তিনতলার বারান্দা থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে আসে- বাহ! সকাল সকাল হত্যার পরিকল্পনা?
নীলা মুখ তুলে দেখে, হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে নীলাব্জ।

নীলা: তোমাকে কেন সব জায়গায় দেখতে হয় বলো তো?
নীলাব্জ: আমি কিছুটা শাহরুখ খান, কিছুটা ফেলুদা আর কিছুটা …
নীলা: ইডিয়েট!

নীলাব্জ হাসে, নীচে তাকিয়ে পাখিটাকে দেখে বলে,
- দেখো কাণ্ড! জাল লাগানোর পরও ঢুকে পড়েছে?
- হ্যাঁ। কাল দু'হাজার টাকা দিয়ে জাল লাগালাম। আজ সকালে দেখি ব্যাটা আমার বারান্দার মালিক সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
- জালওয়ালা কী বলছে?
নীলা রেগে ওঠে।
- বলছে এসিটা নাকি এমন জায়গায় বসানো যে, ওই কোণাটায় জাল পুরো টেনে বাঁধা যায়নি। আমি বললাম, তাহলে কাল বললে না কেন? তাতে বলছে, ও জালের লোক। এসির লোক না। এসি সরাতে হলে আলাদা লোক লাগবে। চাইলে ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত খরচ।
নীলাব্জ চায়ে চুমুক দেয়।
- কথাটা তো ভুল বলেনি।
- কী?
- ও জালের লোক। এসির লোক তো না।
নীলা প্রায় চিৎকার করে ওঠে।
- জালটা কি আমি ডিজাইন করব বলে কিনেছি? পায়রার জাল ও জানে না? পায়রাই যদি না আটকাতে পারে তাহলে কীসের জাল?

মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ দেবে ডেটা?
পড়ুন: নীলা-নীলাব্জ পর্ব ২৬…

নীলাব্জ একটু হেসে ফেলে।
- এই প্রশ্নটাই ওকে করা উচিত ছিল।
নীলা আবার ঝাঁটা তোলে।
- আগে এই অপদার্থটাকে বের করি। তারপর…
- আরে আরে! মারবে নাকি?
- অবশ্যই মারব। গুলি করে মারব!
- বাহ! পশুপ্রেমীদের আরেকটা মুখ দেখলাম।
- আমি পশুপ্রেমী কবে হলাম?
- কুকুর দেখলে তো আদর করো। বেড়াল দেখলে ছবি তোলো। পায়রা দেখলেই খুন করতে ইচ্ছে করছে কেন?
- কারণ কুকুর, বেড়াল আমার বারান্দায় এসে নোংরা করে যাচ্ছে না। এখানে ডিম পেড়ে-পেড়ে পরিবার বৃদ্ধি করছে না।
- সে সুযোগ পাচ্ছে না বলে, পেলে করত।
- তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।

পায়রাটা এদিকে ফুলের টবে ঠোকর মারতে শুরু করেছে।
নীলাব্জ তাকিয়ে বলে,
- দেখো কী শান্ত প্রাণী!
- শান্ত?
- হ্যাঁ।
- শান্ত প্রাণী আমার বাড়ি দখল করেছে।
- ওর মতে তুমিই দখল করেছ।
- এটা আমার ফ্ল্যাট।
- দলিল ওকে দেখিয়েছ?
নীলা চোখ পাকায়- পায়রাকে দলিল দেখাব? কী নেশা করছ সকাল-সকাল?

নীলাব্জ হাসে,
- তুমি তাহলে উচ্ছেদপন্থী!
- মানে?
- মানে ওই হকার, পায়রা, এদের তুমি একদমই…
- পায়রার সঙ্গে হকারের তুলনা কোরো না।
- কেন?
- কী ছেলেমানুষী হচ্ছে নীলাব্জ?

নীলাব্জ হেসে ওঠে।
- না, বারান্দায় পায়রা ঢুকলে তোমার রাগ হয়, ফুটপাতে হকার বসলে তোমার রাগ হয়।
- হবেই তো। ফুটপাত মানুষের হাঁটার জন্য। তুমি আজ সত্যিই অসহ্য। দূর হও। আমার সমস্যার সমাধান তো করতে পারছ না! তার ওপর বাজে তর্ক …
- সমস্যাটা ঠিক কী বলো তো?
নীলা বিরক্ত গলায় বলে-
- জানো না?
- কী?
- আজকাল কেউ কোনও কিছুর দায় নেয় না।

নীলাব্জ ভুরু তোলে।
- এই জালওয়ালার কথা বলছ?
- শুধু ও না। সবাই।
- একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?
- মোটেও না। আমি পায়রা আটকানোর জন্য টাকা দিলাম। এখন বলছে, এসির লোক অন্য, জালের লোক অন্য। কাল এসির লোক আসবে, সে বলবে বিল্ডার এমন করে বানিয়েছে যে, এখানে এসি বসাতে সে বাধ্য হয়েছে। বিল্ডার বলবে আর্কিটেক্টের দোষ। আর্কিটেক্ট অন্য কিছু একটা বলবে। সবাই বলবে আমার দোষ না। আর সব দোষ গ্রাহকের।

নীলাব্জ মাথা নাড়ে।
- কারণ সত্যিই সবার একটু-একটু দোষ আছে।
- আর তাই কারও দোষ নেই। সবাই একটু-একটু করে খুন করলে তো আলাদা করে খুনি কেউ নয়, তাই না?
- ব্যাপারটা এত সহজ না।
- খুবই সহজ। সবাই দায়িত্বটা নেয়, দায় নেয় না।

নীলাব্জ হেসে ফেলে।
- এই দুটোর তফাৎ কী?
- দায়িত্ব মানে কাজটা করা। দায় মানে ফলটা নিজের বলে মেনে নেওয়া।
নীলাব্জ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
- খারাপ বলোনি।
নীলা উৎসাহ পেয়ে বলে-
- দেখো না চারদিকে। প্রতি বছর প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে একটার পর একটা। লক্ষ-লক্ষ ছেলে-মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। বছরের-পর-বছর ধরে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রিপারেশান নিচ্ছে। তারপর দেখছে, প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে। আবার অনিশ্চয়তা। এই সমাজে বড় হয়ে ওঠা তরুণপ্রজন্ম কী শিখছে? তাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু আছে? কেউ ভাবছে? সবাই শুধু বলেই খালাস যে তদন্ত হবে।
- হবে তো।
- কিন্তু দায় কার?
- অনেকের। সবার।
- এটাই তো সমস্যা! ওই যে সেই একই কথা, সবাই মিলে দায়ী মানে, আসলে কেউই দায়ী না।

নীলাব্জ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়।
- আচ্ছা, একজন শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলে শান্তি পাবে?
- হ্যাঁ, পাব! অন্তত একটা বার্তা যাবে। কেউ তো একটা দায় নেবে নাকি?
- তোমার বেসিক্যালি একটা বলির পাঁঠা দরকার।

নীলা বিরক্ত হয়।
- তুমি সবকিছুর উল্টো বলো কেন?
- উল্টো বলছি না। সিস্টেমটার সমস্যা বোঝো। ওই একটা লোকের নয়। আমাদের সবার সমস্যা। আমরা সবাই নিয়ম ভাঙতে চাই। শুধু চাই অন্যরা নিয়ম মেনে চলুক। আসলে আমরা সবাই কোরাপ্ট…
- আর ওই লোকটা হল সমস্ত কোরাপ্ট লোকের পালের গোদা! পালের গোদাটাকে ধরলে, সব ঠিক হবে!
- এটা সমাধান?
- না, সমাধান হল মানুষকে দায়িত্ববান করে তোলা।
- যেমন?
- আজকে সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালগুলোর এরকম জঘন্য অবস্থা কেন? কারণ নেতা-মন্ত্রীর ছেলে-মেয়েরা তো এখানে কেউ যায় না। তারা সবাই প্রাইভেটে যায় কিংবা বিদেশে। যখন নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকবে, সেদিন বুঝবে পাবলিক কীভাবে বাঁচে!
- তুমি কি সত্যিই মনে করো মন্ত্রীরা জানে না হাসপাতালের অবস্থা? সরকারি স্কুলের এই অবস্থা?
- হ্যাঁ জানে তো, তাই জন্যই নিজের পরিবারকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে বাঁচিয়ে রাখে।
- তুমিও তো নিজের শহরের অনেক সমস্যাই জানো। সব ঠিক করতে যাও?
- আমি? আমি কোত্থেকে এলাম এর মধ্যে?
- তুমি-আমি তো সরকার গড়েছি। আমাদের একটা দায়বদ্ধতা …
- একদম ফালতু কথা বলবে না নীলাব্জ! যেদিন মন্ত্রীরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাবে, সেদিন হাসপাতালের বেড, ওষুধ, ডাক্তার- সব ঠিক হবে।

ছবি: এআই নির্মিত

নীলাব্জ হেসে ফেলে।
- হবে না।
- কেন?
- কারণ তখন মন্ত্রীর জন্য সেখানে আলাদা ওয়ার্ড হবে। আলাদা ডাক্তার। আলাদা নার্স। আলাদা লিফট। আলাদা প্রবেশদ্বার। সরকারি হাসপাতালের ভেতরেই আরেকটা বেসরকারি হাসপাতাল বানিয়ে দেওয়া হবে।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলে-
- এত নৈরাশ্যবাদী হলে চলে?
- আমি নৈরাশ্যবাদী না। আমি ভারতীয়।

নীলা চুপ করে থাকে। নীলাব্জ এবার একটু গম্ভীর হয়।
- আচ্ছা। তাহলে তোমাকে একটা অন্য প্রশ্ন করি।
- বলো।
- দেশের বাতাস এত পলিউটেড কেন? রাস্তাঘাট এরকম জঘন্য কেন? চারিদিকে এত নোংরা কেন? নদীগুলো এরকম পলিউটেড কেন?
- মানে? হঠাৎ এরকম অবান্তর প্রশ্ন?
- অবান্তর নয়! দেশ নেতারা, মন্ত্রীরাও তো এই বাতাসেই শ্বাস নেয়। তাদের ছেলে-মেয়েরাও নেয়। তাহলে দূষণ কমছে না কেন? তোমার যুক্তি অনুযায়ী এসব তো অনেক আগেই কমে যাওয়ার কথা। তাই না? কমছে কী? AQI তো প্রতি বছর আরও বাড়ছে। নিজের ছেলে-মেয়েদেরকেই দূষিত বায়ুতে মেরে ফেলছে, এরা নাকি করবে পাবলিকের উপকার।
- আরে ওদের সব কিছুর একটা escape route আছে। সব নেতাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে। NRI-রা বিদেশে বসে দেশপ্রেম দেখায়। নিজেরা কিন্তু ফেরে না। আমরা জ্বলে মরছি এখানে!
- তাহলে সমস্যা-টা জবাবদিহির নয়। সমস্যাটা অসমতার। আর সিস্টেমটা এমনই যে, পারলে পায়রার জাল নিজে কিনে এনে লাগাও। পারলে নিজের সব কাজ নিজে করো। অন্য কেউ দায়িত্ব নেবে না। দায় তখনই নেবে, যদি তার নিজের খুব লাভ থাকে সেখানে।

আজকে সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালগুলোর এরকম জঘন্য অবস্থা কেন? কারণ নেতা-মন্ত্রীর ছেলে-মেয়েরা তো এখানে কেউ যায় না। তারা সবাই প্রাইভেটে যায় কিংবা বিদেশে। যখন নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকবে, সেদিন বুঝবে পাবলিক কীভাবে বাঁচে!

- প্রশ্নটা নৈতিক সততারও। আমি একটা কাজ নিচ্ছি, সেটা কেমন করে করছি তার একটা দায় নেই আমার?
- দায় থাকে, যখন নিজের মান-সম্মান-অর্থ সব জড়িয়ে থাকে। আর আমাদের নৈতিক চরিত্র কি দারুণ? তুমি, আমি, মন্ত্রী, জালের লোক- সবাই চাই সমস্যাটা অন্য কারও হোক। নেতা তো আর অন্য গ্রহ থেকে আসেনি। আমাদের থেকেই এসেছে।
- ওই জালের লোকটাকে এক মাস এনে এই বারান্দায় থাকতে দি। ঠিক বুঝবে সমস্যাটা কোথায়! সব নৈতিক চরিত্র ঠিক হয়ে যাবে!
- পায়রাগুলোর সঙ্গে?
- হ্যাঁ। তখন দেখবে gap-টা একদিনেই বন্ধ হয়ে গেছে।
- এটা আবার গরীব মানুষের ওপর অত্যাচার। তোমার বড়লোক বিল্ডারকে কিন্তু তুমি কিছু করতে পারবে না। বলতে পারবে, এত খারাপ প্ল্যানিং কেন? তাকে পারবে এনে এই বারান্দায় রাখতে?
-ঠিক। কারণ বিল্ডারকে ধরার ক্ষমতা আমার নেই। জালের লোকটাকে ধরার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ভোটারের মন্ত্রীর উপর ক্ষমতা থাকার কথা।

পায়রাটা আবার বক-বকুম করে ওঠে।
নীলাব্জ আঙুল তুলে পাখিটার দিকে দেখায়।
- ওও একমত।
- ওকে নিয়ে যাও তোমার বারান্দায়।
- পায়রা? কেন?
- তোমার তো দরদ বেশি!
- না, না, আমার কোনও দায় নেই! তোমার পায়রা তুমি সামলাও!

নীলা ঝাঁটাটা ছুঁড়ে মারার ভান করে।
নীলাব্জ দাঁত বের করে হাসে।
পায়রাটা এবার উড়ে যায়।

ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla