Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
পাথুরে বিচ্ছেদ

পাথুরে বিচ্ছেদ

Daak Bangla 1 day ago

খনও অ্যালপাইন ডিভোর্স-এর কথা শুনেছেন? ডিভোর্সের রকমভেদে যুক্ত হওয়া নতুন শব্দবন্ধনী। দ্রুত গতির জীবনে নিত্যনতুন কত-কত অলংকার আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে, বিচ্ছেদের নতুন নামকরণ হচ্ছে। সম্পর্ক ভাঙার নতুন পন্থা তৈরি হচ্ছে। সমাজমাধ্যমের দৌলতে দ্রুত আয়ত্ত করে নিচ্ছি সেইসব পন্থা। অদ্ভুত সেই নামকরণ।

ইদানীং চর্চায় উঠে এসেছে 'অ্যালপাইন ডিভোর্স'। 'অ্যালপাইন ডিভোর্স' বলতে এমন একধরনের বিচ্ছেদকে বোঝানো হয়, যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা বা দম্পতি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও পাহাড়ি, দুর্গম বা নির্জন স্থানে (যেমন ট্রেকিং বা হাইকিংয়ের সময়) গিয়ে সম্পর্কের ইতি টানেন। এখানে 'ডিভোর্স' শব্দটি আইনি বিচ্ছেদ নয়, বরং একটি প্রতীকী ও মানসিক বিচ্ছেদকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, সম্পর্ক শেষ করার ঘটনাটিকে এমন এক প্রেক্ষাপটে ঘটানো হয়, যেখানে চারপাশের পরিবেশ কঠিন, নিঃসঙ্গ এবং চ্যালেঞ্জিং।

এই ধারণার মূল দিকটি হল বিচ্ছেদকে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে তৈরি করা। পাহাড়ে ওঠা যেমন শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর এবং মানসিকভাবে পরীক্ষার মতো, ঠিক তেমনই সম্পর্ক ভাঙার মুহূর্তটিকেও এখানে একধরনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতায় পরিণত করা হয়। অনেকেই মনে করেন, শহরের ভিড়, সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি, দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে দূরে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিলে, সেই বিষয়টা বেশি স্পষ্ট ও নির্ভেজাল হয়। তাই এই ধরনের বিচ্ছেদে একটা নাটকীয়তা থাকে। সম্পর্কের শেষটা সাধারণ নয়, বরং স্মরণীয় করে রাখার মতো হয়। তবে এই প্রবণতা নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনাও রয়েছে। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে কাউকে ছেড়ে দেওয়া মানে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া ব্যক্তি ভয়, অসহায়তা বা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন: 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' দেশভাগের বিচ্ছিন্ন স্মৃতির আখ্যান!
লিখছেন ঋকসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায়…

অ্যালপাইন ডিভোর্স শব্দবন্ধটির জন্ম সাহিত্য-পরিসরে। ১৮৯৩ সালে স্কটিশ-কানাডিয়ান লেখক রবার্ট বার তাঁর একটি ছোটগল্পে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। গল্পটির প্রেক্ষাপট ছিল সুইস আল্পস পর্বতমালা, যেখানে এক দম্পতির সম্পর্ক এমন চরম টানাপোড়েনে পৌঁছায় যে, বিচ্ছেদ আর কেবল আইনি বা সামাজিক বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে একধরনের বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের প্রতীক। সেই সময় এই শব্দবন্ধটি মূলত রূপক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই শব্দটি প্রায় বিস্মৃতই ছিল। নতুন করে এটি আলোচনায় আসে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে, বিশেষ করে ২০২০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা জটিল অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষিতেই অ্যালপাইন ডিভোর্স শব্দটি নতুন অর্থ পায়। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তার সঙ্গীকে পাহাড়ি বা দুর্গম পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে সম্পর্ক শেষ করে দেয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা অনলাইন ম্যাগাজিনে এই ধরনের গল্প বা আলোচনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং শব্দবন্ধটি আবার জনচর্চায় ফিরে আসে। এর জনপ্রিয়তা বাড়ার পিছনে কিছু বাস্তব ঘটনাও ভূমিকা রাখে, যেখানে পর্বতারোহণ বা ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গীকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে আসার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। ফলে অ্যালপাইন ডিভোর্স আর শুধুই একটি সাহিত্যের অলীক কল্পনা থাকে না, হয়ে ওঠে আধুনিক সম্পর্কের এক বিতর্কিত ও উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। একদিকে এটি নাটকীয়তার কারণে মানুষের কৌতূহল জাগায়, অন্যদিকে এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে নিষ্ঠুরতা।

মানুষ কেন অ্যালপাইন ডিভোর্স-এর মতো এক অস্বাভাবিক ও চরম বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন? এর পিছনে রয়েছে আধুনিক মানসিকতার এক জটিল স্তর। আজকের সময়ে অনেকেই নিজের জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে তুলতে চান। ভালবাসা যেমন বিশেষ, তেমনই তার শেষটাও যেন অন্যরকম হয়, এমন এক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণভাবে সম্পর্ক ভাঙার বদলে কেউ-কেউ এমন একটি পরিস্থিতি বেছে নেন, যেখানে পরিবেশ নিজেই বিচ্ছেদের নাটকীয়তা বাড়িয়ে দেয়। পাহাড়, নির্জনতা, কঠিন পথ সব মিলিয়ে সেই মুহূর্তটি যেন আরও গভীর ও স্মরণীয় হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও। অনেকেই সরাসরি বিচ্ছেদের কথা বলতে পারেন না। তাদের মধ্যে থাকে ভয়, সংকোচ বা অপরাধবোধ। তাই এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যেখানে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াটা যেন নিজের সিদ্ধান্ত না হয়ে পরিস্থিতির ফল বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারই এক রূপ, যেখানে অন্য মানুষটির মানসিক অবস্থার কথা বিশেষভাবে ভাবা হয় না।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা। সম্পর্কের শেষ মুহূর্তেও কে সিদ্ধান্ত নেবে, কীভাবে সবকিছু শেষ হবে, এই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যে কাজ করে। অ্যালপাইন ডিভোর্স সেই নিয়ন্ত্রণকে এক চরম রূপ দিয়েছে, যেখানে একজন পুরো পরিস্থিতি পরিচালনা করে এবং অন্যজনকে অসহায় অবস্থায় ফেলে দেয়। এর ফলে বিচ্ছেদ আর সমানভাবে ভাগ করা একটি সিদ্ধান্ত থাকে না, বরং একতরফা ক্ষমতার প্রকাশ হয়ে ওঠে। এছাড়া অনেকের মধ্যে একটি ধারণা কাজ করে যে, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা প্রয়োজন। সব যোগাযোগ, সব স্মৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়া। নির্জন পাহাড়ি পরিবেশ সেই বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই ভাবনা অনেক সময় মানবিক সহানুভূতি ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে যায়। সব মিলিয়ে, এই ধরনের বিচ্ছেদের পিছনে যে মানসিকতা কাজ করে, তা আসলে এক অস্থির ও আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতার পরিচয় দেয়। এখানে সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে নিজের অনুভূতি, নিজের অভিজ্ঞতা এবং নিজের সিদ্ধান্তকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যার ফলে ভালবাসার শেষটা কখনও-কখনও অমানবিক হয়ে ওঠে।

দার্জিলিং, সান্দাকফু বা হিমালয়ের বিভিন্ন ট্রেকিং রুটে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। শুধু উত্তরাখণ্ড রাজ্যেই বছরে আনুমানিক দু'লক্ষেরও বেশি ট্রেকার পাহাড়ি অভিযানে অংশ নেন। এই ধরনের যাত্রায় শারীরিক ক্লান্তি, অক্সিজেনের স্বল্পতা, হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, সব মিলিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

মানুষের সম্পর্ক ভাঙার নির্মমতা নতুন কিছু নয়। অতীতেও বহুবার দেখা গিয়েছে, কেউ কাউকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে এসেছে, প্রতারণা করেছে বা হঠাৎ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। সেই অর্থে অ্যালপাইন ডিভোর্সের মূল ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। কিন্তু এর নতুনত্ব লুকিয়ে রয়েছে আমাদের সময়ের ভিন্ন সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপটে। আগে এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা জনসমক্ষে আসত না। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে এবং একটি নির্দিষ্ট নাম ও পরিচয় পাচ্ছে। ফলে যা আগে নিছক একটি ঘটনা ছিল, এখন তা একধরনের প্রবণতা বা ধারা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দার্জিলিং, সান্দাকফু বা হিমালয়ের বিভিন্ন ট্রেকিং রুটে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। শুধু উত্তরাখণ্ড রাজ্যেই বছরে আনুমানিক দু'লক্ষেরও বেশি ট্রেকার পাহাড়ি অভিযানে অংশ নেন। এই ধরনের যাত্রায় শারীরিক ক্লান্তি, অক্সিজেনের স্বল্পতা, হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, সব মিলিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, চরম পরিবেশে মানুষের তাৎক্ষণিক ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা প্রায় ৩০-৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অস্থিরতা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে অ্যালপাইন ডিভোর্সের ধারণাটি কেবল একটি পাশ্চাত্য প্রবণতা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যেতে পারে। বিশেষত, আমাদের সমাজে যেখানে এখনও প্রায় ৭০% বেশি সম্পর্ক পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেখানে বিচ্ছেদ অনেক সময় সরাসরি প্রকাশ করা কঠিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস সংক্রান্ত দুর্ঘটনার মধ্যে প্রায় ৬০% ক্ষেত্রই ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত। গত পাঁচ বছরে ভারতীয় হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায়। এমনকী, উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় সান্দাকফু ট্রেক রুটেও একাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, যার ফলে প্রশাসন পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। এই বাস্তবতায় দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে একা ফেলে দেওয়া মানে শুধু মানসিক আঘাত নয়, বরং তাকে সরাসরি জীবনসংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া।

ফলে অ্যালপাইন ডিভোর্সকে কেবল একটি রোমাঞ্চকর বা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এটি সামাজিক, মানসিক এবং শারীরিক তিনটি স্তরেই গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এখানে বিচ্ছেদ আর কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা মানবিক দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা এবং নৈতিকতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে। একসময় ভালবাসার ইতি টানা হত নীরবতা, দূরত্ব কিংবা অপ্রকাশিত অভিমানের ভেতর দিয়ে। সম্পর্ক ভাঙা মানে ছিল ধীরে-ধীরে সরে যাওয়া। কখনও চিঠির উত্তর না আসা, কখনও দেখা না হওয়ার অজুহাত, কখনও বা পরিবার ও সামাজিক চাপে সম্পর্কের নিঃশব্দ সমাপ্তি। সেই বিচ্ছেদে নাটকীয়তা কম, কিন্তু আবেগের গভীরতা ছিল প্রবল। সেখানে সম্পর্কের শেষটাও ছিল একধরনের ব্যক্তিগত বেদনা, যা প্রকাশের চেয়ে বেশি লুকিয়ে রাখার বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই চিত্র বদলেছে। বিচ্ছেদ আর নিঃশব্দ নয়, বরং তা ক্রমশ দৃশ্যমান, কখনও কখনও প্রদর্শনযোগ্য হয়ে উঠছে। অ্যালপাইন ডিভোর্সের মতো ধারণা সেই পরিবর্তনেরই চরম রূপ, যেখানে সম্পর্কের শেষটা শুধুই ক্লাইম্যাক্সের মতো টানটান নয়, একই সঙ্গে নির্মমও।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla