Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
সামথিং সামথিং: পর্ব ৭৮

সামথিং সামথিং: পর্ব ৭৮

Daak Bangla 2 weeks ago

যত মার তত মজা

ধ্যবিত্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য হল, গরিব ও বড়লোক- দুজনকেই তেড়ে ঘেন্না করা যায়, এবং ভিন্ন কারণে। গরিবও মধ্যবিত্ত এবং বড়লোক দুজনকেই ঘেন্না করে, কিন্তু তা দুজনই তার চেয়ে ক্ষমতাবান বলে। বড়লোকও মধ্যবিত্ত ও গরিব উভয়কেই ঘেন্না করে, দুজনেই তার তুলনায় ক্ষমতাহীন বলে।

কিন্তু মধ্যবিত্তই একমাত্র গোষ্ঠী, যা একটা বর্গকে ক্ষমতাবান বলে এবং অন্য একটা বর্গকে ক্ষমতাহীন বলে ঘেন্না করতে পারে। তাই গরিবের পেটে লাথি মেরে স্টেশন-চত্বর পরিষ্কার করলেও তার আনন্দ- মরুক ব্যাটারা। আবার ক্ষমতাবানের মাথায় ডিম ছুড়লেও তার আনন্দ- অনেক বাড়িগাড়ি হাঁকিয়েছিল না, এবার বুঝুক। এই যে দিকে-দিকে আনন্দের ভাঁড়ার পাতা আছে, এই কারণেই মধ্যবিত্ত এত ছটফটে ও বাক্যময়।

মানুষ কি সংবাদের দাস হয়ে থাকবে? পড়ুন 'সামথিং সামথিং' পর্ব ৭৭…

ভিড়ের বিচারপদ্ধতি সাধারণত ইতরতায় চোবানো। আর-জি-কর আন্দোলনে রাতদখলে বেরিয়ে বহু মানুষ বলেছিল, অমুককে আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক, আমরা বুঝে নিচ্ছি। ফেসবুকে এই ভিড় নামজাদা লোকজনকে হরবখত চূড়ান্ত অপমান করছে। সবাই মিলে পরাজিতকে ঘিরে ধরে 'চোর' বলার মধ্যে আক্রোশ আছে, নিরাপদ আমোদও (কারণ এখন এ নির্বিষ, ফিরতি-ছোবলের সম্ভাবনা নেই), এবং চলতি হওয়ার স্বস্তিও (এই অপমানটা এখন 'ট্রেন্ডিং')। ভিড়ের রকমসকম দেখে যারা খিলখিলিয়ে অস্থির, তাদের যুক্তি কী? সম্পন্ন বিপন্ন হয়েছে, দ্যাখ কেমন লাগে। এছাড়া বিপ্লবানুরাগ। স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ মানেই নাকি সঙ্গত। এর আগে মনমোহন সিং, রাহুল গান্ধী, পি চিদাম্বরম, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, এল কে আদবানির দিকে জুতো ছোড়া হয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতকে চড় মারা হয়েছে। বিভিন্ন নেতাকে কালি ছোড়ার ঘটনাও আছে। প্রতিটিতেই মধ্যবিত্ত মনে করেছে, অথরিটিকে অপমান ঘটেছে তো, বেএএএশ হয়েছে। প্রায় যে-তত্ত্বে গাড়ির সঙ্গে পথচারীর ধাক্কা লাগলে, প্রশ্ন করার আগেই ড্রাইভারকে রদ্দা কষানো হয়: বড়লোক সর্বদা ভিলেন। কিন্তু গরিবকেও সর্বদা মোটে ছাড় দেওয়া হবে না। কারণ মধ্যবিত্ত গাড়ির ভেতরেও থাকতে পারে।

সেই কারণেই, হকারদের কোনও সময় না দিয়ে এবং পুনর্বাসনের কোনও বন্দোবস্ত না করে হুড়মুড়িয়ে দোকান গুঁড়িয়ে, এবং সেই ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দামি বাইক মসৃণ ছোটানো যাবে এমন অশ্লীল আস্ফালন দাবড়ে, শাসক দল দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছে এবং তখন মধ্যবিত্তের কর্তৃপক্ষ-বিদ্বেষ কিছুতে জাগ্রত হচ্ছে না। কারণ মধ্যবিত্ত মনে করে, তাকে খেতে না-দিয়ে বড়লোকেরা যদি ইউরোপ বেড়ায়, তা অন্যায়, কিন্তু গরিবকে খেতে না দিয়ে মধ্যবিত্ত যদি জোম্যাটোয় পিৎজা আনায়, তা তার হকের ধন। গরিবরা ময়লা পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে রাস্তা জুড়ে থাকে, নখের তলায় নোংরার ডাঁই, তদুপরি স-স করে কথা বলে। তাই ফুটপাথের গরিবগুলোকে গুলি করে পুঁতে দিলে মধ্যবিত্তের তেমন আপত্তি হবে না। বোম মেরে বস্তি উড়িয়ে দিলে একটু অসুবিধে হবে বটে (ড্রাইভার আর ঝি কোত্থেকে আসবে), কিন্তু পলিসি-টায় সে একমত হবে। তাই কিছু হকার-পরিবার যদি না-খেয়ে মরে, আর তার বদলে শহর হয়ে ওঠে ফাঁকা ও দৃষ্টিনন্দন- বহুৎ আচ্ছা। সত্যি বলতে, এ তার বহুদিনের ফ্যান্টাসি। এবং বদ-শাসক বলতে সে এখনও তৃণমূলকেই বোঝে। তাই নতুন শাসক মুসলমানদের টাইট দেবে, একইসঙ্গে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নিঘিন্নে গরিবগুলোকেও টাইট দেবে- দ্বিগুণ জিলিপি পেয়ে হিন্দু মধ্যবিত্তের লাল পড়ে হোয়াটসঅ্যাপ ভিজে যাচ্ছে।

মধ্যবিত্ত মনে করে, তাকে খেতে না-দিয়ে বড়লোকেরা যদি ইউরোপ বেড়ায়, তা অন্যায়, কিন্তু গরিবকে খেতে না দিয়ে মধ্যবিত্ত যদি জোম্যাটোয় পিৎজা আনায়, তা তার হকের ধন। গরিবরা ময়লা পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে রাস্তা জুড়ে থাকে, নখের তলায় নোংরার ডাঁই, তদুপরি স-স করে কথা বলে। তাই ফুটপাথের গরিবগুলোকে গুলি করে পুঁতে দিলে মধ্যবিত্তের তেমন আপত্তি হবে না।

সে কি চিরকালই এমন অ-দরদি হিংস্র, না কি সম্প্রতি হয়েছে? সামাজিক মাধ্যম তাকে এমন ফ্যাশনদুরস্ত শয়তান বানাল, না কি সে অ্যাদ্দিন একটা বামপন্থী সমানুভূতির দেখানে-কম্বল জড়িয়ে রাখত, এখন সেটাকে ত্যাগ দিয়েছে? চ্যানেলে-চ্যানেলে গরিবদের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার সমর্থনের দুঃসাহস সঞ্চালকেরা পাচ্ছেন কোত্থেকে? একটা ভদ্র ও সভ্য সমাজের বুকে দাবড়ে তো এসব কথা উচ্চারণ করা যায় না: যাঁরা অন্যায় উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন তাঁরা বোকা, এবং যাঁরা নির্দয় নৃশংস তাঁরা দুর্দান্ত সংস্কারক? গরিবদের হয়ে যে-পার্টি ঝান্ডা ধরত (প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে), তারা কোনও কারণে গত ১৫ বছরেও কাঙ্ক্ষিত বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপিত করতে পারেনি। আর দুর্দান্ত বিরোধিতা গড়ে তোলায় যিনি চ্যাম্পিয়ন, তিনি আচম্বিত পরাজয়ে বুঝভোম্বল হয়ে আছেন। বুদ্ধিজীবীদের কেউ-কেউ ভয়ে সিঁটিয়ে (কোত্থেকে এফআইআর ধেয়ে আসবে)। কিন্তু সাধারণ সমাজে কোনও ক্ষোভ, অসন্তোষ, বা অন্তত চাইনিজ চিবোতে-চিবোতে 'ইস গো, ছি ছি' মার্কা চুকচুক কি দেখা যাচ্ছে? বরং উলটো, সকলে বেশ উৎসব-মুডে। কক্রোচ-জনতা-পার্টির উত্থানে তারা কৌতুকঋদ্ধ, কিন্তু মোটে বিবেক-বিদ্ধ নয়। তাদের মনে হচ্ছে না, এই দেশটা বা রাজ্যটা শুধুমাত্র কয়েকজন বড়লোক ও বড়লোক-হতে-উন্মুখ মধ্যবিত্তের হাতে রিবন মুড়ে তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং সেজন্য কিছু মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা এমনিতেই সবচেয়ে বড় বে-জাত, অন্তেবাসী- অর্থাৎ গরিব। তাদের মনে হচ্ছে না, কোনও দায়িত্ববান রাষ্ট্র বা সরকার এই কাজ করতেই পারে না। মনে হচ্ছে না, অন্তর্ভুক্তির বদলে বহিষ্করণ যে-দলের প্রকল্প- তাকে সমর্থনের মধ্যে অশিষ্টতা আছে।

বরং মানুষ বাদ পড়ছে, মানুষকে তাড়ানো হচ্ছে, মানুষকে অত্যাচার করা হচ্ছে, এর মধ্যে নব-নব উল্লাসের উপাদান বাঙালি মধ্যবিত্ত তারিয়ে-তারিয়ে খুঁটছে। অন্যের বিপদ হলে, এবং সেই আঁচ নিজের গায়ে না লাগলে, তাকে সুখের মতোই চাখা যায়- কে যেন বলেছিলেন। কেউ না বললেও কিছু এসে যায় না, কারণ উগ্র ও কর্কশ হয়ে এখন আমরা গর্ব অনুভব করি, বর্বরতাকে বীরত্ব বলে ভজিয়ে নিই, শুধু আমারটা বুঝব এবং অন্যেরটা দলেপিষে ছারখার করব- এই অমানবিক স্বার্থপরতাকে দেশের অবশ্যকর্তব্য বলে মাথায় তুলে নাচি। কোনও দলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রহার-প্রবৃত্তি লকলক না করলে আজ এই মারকুটে-পনার জয় দেখতে হত না। মধ্যবিত্ত চিরকালই কদর্যচিত্ত, দাঙ্গার সিংহাসনে সে চিরকালই নায়ক খুঁজে পেয়েছে, বৈঠকখানার আড্ডায় সে সরাসরি সাম্প্রদায়িক সেডিস্ট, এখন ঠিকঠাক ইন্ধন ও প্রশ্রয় পেয়ে তার নীচতা নতুন ভোজালির মতো চকচকাচ্ছে। অসহায়ের, প্রতিরোধহীনের পাঁজরা গুঁড়িয়ে দিয়ে সরকার ও মধ্যবিত্তের যৌথ নাচ নির্ঘাত উদয়শঙ্করাতীত। অচিরে মা দুর্গার বাহন হিসেবে বুলডোজার গড়ার আবদার কুমোরটুলিতে পৌঁছল বলে।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla