চারুবাক
ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় 'গুপ্তধন' (সুপ্তধন মোটেই নয়, যেমনটি বলেছেন গল্পের অন্যতম খলনায়ক দশানন!) সিরিজের চতুর্থ ছবি 'সপ্তডিঙার গুপ্তধন'। সপ্তডিঙার গল্প বাঙালি পাঠক পড়েছেন চাঁদ-সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রার 'মঙ্গলকাব্য' কাহিনীতে। সপ্তডিঙার এক ডিঙা ছিল মধুকর!
এই ছবির দুই চিত্রনাট্যকার ধ্রুব এবং সুগত গুহ সপ্তদশ শতকে দিল্লির বাদশা আকবর ও যশোরের প্রতাপশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের কাহিনীর সঙ্গে মঙ্গলকাব্যের মতো লোকগাথা এবং ইতিহাস নিয়ে মজাদার 'ককটেল' বানিয়ে আরও দারুণ মজাদার এই ছবিটি বানিয়েছেন।
Advertisement
কাহিনীর বাঁকে বাঁকে রেখেছেন ছড়া ও কবিতার নানান ধাঁধাঁ! এই সিরিজের আগের তিনটি ছবির তুলনায় এখানে ছন্দে বাঁধা ধাঁধার রহস্য উন্মোচন করতে কিশোর দর্শকদের মধ্যে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে। কিন্তু সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন পরিচালক একের পর এক ঘটনার আকস্মিকতা দিয়ে। জলে জঙ্গলে সুন্দরবনের লোকেশনকে সিনেমাটোগ্রাফার সৌমিক হালদারও আরও সুন্দর করে বুনেছেন তাঁর ক্যামেরায়! 'ট্রেজার অফ সিয়েরা মাদ্রে', 'কিং সলোমন মাইনস' বা 'ক্যারিবিয়ান' সিরিজের মতো ঝক্কিপনা না থাকলেও জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ নিয়ে বাস করা সুন্দরবনের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রারও আংশিক ডকুমেন্টশন এই ছবি থেকে চোখ
ফেরানো দুষ্কর।
Advertisement
সবার ওপরে রয়েছে গল্পের চমক। আর রয়েছেন অক্সফোর্ড থেকে পাশ করা ইতিহাসবিদ সুবর্ণ সেন অর্থাৎ গোয়েন্দা সোনাদা। যিনি হিস্ট্রি ছেড়ে এখন ভাইপো আবির আর তার হবু স্ত্রী ঝিনুকের সঙ্গে মিস্ট্রি অর্থাৎ রহস্যে ঘেরাটোপে থাকা গুপ্তধনের খোঁজে ব্যস্ত। এই চরিত্রের মধ্যে ফেলুদার মতো সাধারণ জ্ঞান ও মগজাস্ত্রের ব্যবহারটা চোখে পড়ে। আর বাঙালি দর্শক গোয়েন্দা রহস্যগল্পের বড় লোভী। সুতরাং ইতিহাস, পুরাণকথা, লোকগাথা এবং উর্বর কল্পনাশক্তির মিশ্রণ দেখতেও দর্শকের আলস্য নেই।
পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় তাই গল্পের এবং চিত্রনাট্যের প্রতিটি বাঁকে রহস্য ও রোমাঞ্চের
খোরাক বেশ জম্পেশভাবেই মিশিয়ে দিয়েছেন। এনেছেন মজাদার দুই ভিলেন দশানন ও আদিত্য গুহকে। এঁরা দু'জনই (রজতাভ দত্ত এবং কৌশিক গাঙ্গুলি) ছবির দ্বিতীয় পর্বটিকে বিনোদনের আকর্ষণীয় 'মেনু' করে তুলেছেন। আর হিস্ট্রি ছেড়ে মিস্ট্রির পেছনে ছোটার অক্সফোর্ড স্নাতক সোনাদা অর্থাৎ আবির চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর দুই সাকরেদ আবিরলাল-অর্জুন চক্রবর্তী, ঝিনুক-বেশী ইশা সাহা- এই তিন থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের বেশ জোরালো 'কামরাডোরি'তে জমজমাট হয়েছে পুরো ছবির শরীর, বুনন এবং উপস্থাপনা। আবিরের ব্যক্তিত্ব
এবং দুই সাকরেদের প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালোবাসার প্রকাশ সুন্দর। সমান তালে 'পেটুক' অর্জুন
আর তার প্রেমিকা কাম হবু বধূ ইশা সাহা সঙ্গত করে গেছেন।
সুন্দরবনের কুমারী লোকেশন তো বটেই, মাতলা নদীর ওপর স্টিমার ভ্রমণ যেমন চোখের আরাম, তেমনই রহস্যের দরজা খুলে পাতালে সুড়ঙ্গের তৈরি করা সেটও আগের তুলনায় অনেক চমকদার, চটকদারও। তবে এটাও বলতে হবে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের আবহ রচনা তো বটেই এবং 'হিস্ট্রি প্রফেসর সুবর্ণ সেন/ মিস্ট্রির মধ্যে ঢুকে পড়েছেন…' গানটিও বিভিন্ন সময় ব্যবহার করে বাড়তি গতিময় করেছেন ছবিটিকে। এই ছবি একা দেখার নয়, বাড়ির ছোটবড় মাঝারি সববয়সীদের নিয়ে বসে দেখার। চলছে গরমের ছুটি। সুতরাং বলাই যায়, 'সামার ভ্যাকেশন জমজমাট উইথ আবির অ্যান্ড কোং।'
Advertisement

