Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
বিশ্বে ভারতের কণ্ঠস্বর

বিশ্বে ভারতের কণ্ঠস্বর

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই, অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্যিক সংঘাত এবং বৃহৎ শক্তিগুলির পারস্পরিক অবিশ্বাস। এমন এক সময়ে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলন ভারতের সামনে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

এসসিও-র মতো বড় আন্তর্জাতিক সংগঠনের সম্মেলনে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও যৌথ ঘোষণাই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু আসল কূটনীতি প্রায়ই ঘটে সম্মেলনের বাইরের বৈঠকগুলিতে। রাষ্ট্রনেতাদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ, সংক্ষিপ্ত কথোপকথন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের প্রকাশ্য মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক তৎপরতাতেও সেই কূটনৈতিক সক্রিয়তার ছবি দেখা গিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ভারত যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বাড়াতে আগ্রহী, সেই বার্তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে এবং ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলির উপরও চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও আরও বিস্তৃত করার ইচ্ছা প্রকাশ নিছক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানের বার্তাও।

ভারতের বিদেশনীতি বরাবরই তার নিজস্ব স্বার্থ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ইরান, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। কোনও একটি শক্তির শিবিরে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে আবদ্ধ না করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাই ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে বেশি লাভজনক। বর্তমান অস্থির বিশ্বে এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ভারত শুরু থেকেই বলে আসছে, যুদ্ধ কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে সরাসরি আলোচনা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা ভারত বারবার বলেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, তার মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও তত গভীর হচ্ছে। ফলে শান্তির পক্ষে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে ভারতের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তানের মদতে সীমান্তপারের সন্ত্রাসের অভিযোগ ভারত দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী পুনরায় স্পষ্ট করেছেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোনও রাষ্ট্র যদি সন্ত্রাসবাদকে নিজের রাজনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তার বিরুদ্ধেও বিশ্বকে একইভাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

অবশ্য শুধু বক্তব্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান হয় না। একটি বিবৃতি যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিংবা সন্ত্রাসবাদের জাল একদিনে ছিন্ন করতে পারে না। কিন্তু কূটনীতিতে বক্তব্যের গুরুত্বও কম নয়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে নানা সংঘাত তৈরি হয়েছে, তখন দায়িত্বশীল ও সংযত কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি।

ভারতের সেই ভূমিকা নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে ভারতের গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ, ইরান, মধ্য এশিয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে। এই বহুমুখী সম্পর্ক ভারতকে অন্য অনেক দেশের তুলনায় একটি বিশেষ কূটনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।

তাই এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের সমন্বয়। ভারতকে এবার শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা মোকাবিলাতেও ভারতকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ দেখাতে হবে।

শীতল যুদ্ধের পর পৃথিবী আজ প্রবল অনিশ্চিত এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুরনো মিত্রতা বদলাচ্ছে, নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে ভারতের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে- কোনও পক্ষের অন্ধ অনুসারী না হয়ে শান্তি, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে একটি বিশ্বাসযোগ্য শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এসসিও সম্মেলনে ভারতের বক্তব্য সেই পথের একটি ইঙ্গিত মাত্র। এখন সেই কথাকে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করাই হবে ভারতের আসল পরীক্ষা।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman