Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
ব্রিকস থেকে ভারত কী পেল? দিল্লির কূটনীতির আসল সাফল্য কোথায়

ব্রিকস থেকে ভারত কী পেল? দিল্লির কূটনীতির আসল সাফল্য কোথায়

দিল্লিতে তিন দিন ধরে চলা ব্রিকস সম্মেলন শেষ। কিন্তু সম্মেলনের মঞ্চে হাত মেলানো, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা কিংবা ঘোষণাপত্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যের বাইরে আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়- এই সম্মেলন থেকে ভারত আদতে কী পেল?

সহজ উত্তর, কোনও একটি চুক্তি বা নাটকীয় ঘোষণায় তার হিসাব মেলানো যাবে না।

দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল, দ্রুত বদলে যাওয়া এবং ক্রমশ খণ্ডিত হয়ে পড়া বিশ্বব্যবস্থায় ভারত নিজের অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট করতে পেরেছে।

ব্রিকসকে ভারত বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখে এসেছে। অ-পশ্চিমি দেশগুলির স্বরকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালো করা, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের দাবি তোলা-এই জায়গাগুলিতে ব্রিকস ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে নয়াদিল্লি এটাও জানে, ব্রিকস যদি সরাসরি পশ্চিম-বিরোধী রাজনৈতিক জোটে পরিণত হয়, তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পক্ষে সুবিধাজনক হবে না।

ভারতের লক্ষ্য তাই বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে ফেলা নয়, বরং তার ভিতরে নিজের জায়গা আরও শক্ত করা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার, বিশ্বব্যাঙ্ক কিংবা রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বৈশ্বিক দক্ষিণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা চাপের বিরুদ্ধে তুলনামূলক সুরক্ষা তৈরি-এই দাবিগুলি ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সেই লড়াই করতে গিয়ে পশ্চিমি বাজার, বিনিয়োগ, পুঁজি ও প্রযুক্তির দরজা বন্ধ করে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।

এই ভারসাম্যের কূটনীতি ভারতের কাছে নতুন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাই নয়াদিল্লির অন্যতম বড় শক্তি। তাই ব্রিকসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'ব্রিকস কারও বিরুদ্ধে নয়' বার্তাকে সেই পুরনো নীতিরই নতুন করে ঘোষণা বলা যায়।

পশ্চিম-বিরোধী মঞ্চ নয়, বাস্তব স্বার্থের মঞ্চ

দিল্লির সম্মেলনকে আমেরিকা-বিরোধী রাজনৈতিক বার্তার মঞ্চে পরিণত করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ভারত সেই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর মতো কোনও যুগান্তকারী ঘোষণা হয়নি। হয়নি দ্রুত ডলার-বর্জনের ঘোষণাও।

বরং আলোচনার কেন্দ্রে ছিল অপেক্ষাকৃত বাস্তব ও কার্যকর বিষয়। নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল, ডিজিটাল পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার-এই বিষয়গুলিই সামনে এসেছে।

এটাই ভারতের কাঙ্ক্ষিত পথ। পশ্চিমি ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে আর একটি কঠোর রাজনৈতিক বা আর্থিক বলয় তৈরি করা নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার ভিতরেই ভারতের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে বিকল্প তৈরি রাখা।

দিল্লি ঘোষণাপত্রে কূটনৈতিক সাফল্য

ব্রিকস যত বড় হয়েছে, সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্যও তত বেড়েছে। ফলে সমস্ত সদস্যকে এক জায়গায় এনে একটি সর্বসম্মত ঘোষণাপত্রে পৌঁছনোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সেই জায়গায় দিল্লির সাফল্য কম নয়। পশ্চিম এশিয়ার একাধিক প্রশ্নে সদস্য দেশগুলির স্বার্থ ও অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলির মধ্যেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য। তার পরেও সর্বসম্মতভাবে 'নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন' গ্রহণ করা ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ।

তবে এখানেই ব্রিকসের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এই গোষ্ঠী বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ দেশকে একই টেবিলে বসাতে পারে, আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে, কিছু সাধারণ নীতিতে ঐকমত্যও তৈরি করতে পারে। কিন্তু সদস্য দেশগুলির স্বার্থ সরাসরি সংঘর্ষে জড়ালে দায় নির্ধারণ বা সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার মতো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও ব্রিকসের নেই।

ফলে ঐকমত্য ধরে রাখতে ঘোষণাপত্রের ভাষাও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ, সতর্ক এবং কূটনৈতিক রাখতে হয়েছে।

রাশিয়া পাশে, কিন্তু কোনও শিবিরে নয়

শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মোদী-পুতিন বৈঠকও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ধারাবাহিকতা যে এখনও অটুট, সেই বার্তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা রাশিয়া ক্রমশ চিনের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠলেও ভারতের কাছে মস্কো এখনও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত অংশীদার। তবে সম্পর্ককে শুধু অপরিশোধিত তেল কেনা বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না নয়াদিল্লি। প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই রুশ বা চিনা নেতৃত্বাধীন কোনও নতুন ভূরাজনৈতিক শিবিরে ভারতের যোগদান নয়। বরং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতারই অংশ।

মোদী-শি বৈঠক: বরফ গলেছে, অবিশ্বাস নয়

দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ঘটনা সম্ভবত মোদী-শি বৈঠক। প্রায় সাত বছর পর চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর দুই দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে সরাসরি যোগাযোগের পথ আবার খুলেছে।

বৈঠকে সীমান্ত সমস্যা দিয়েই আলোচনা শুরু হয়নি। বরং বাণিজ্য, যাতায়াত, যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি, চিন-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং চিনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রকৃত প্রবেশাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এসেছে।

তবে এটাকে ভারত-চিন সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা বলে দেখলে ভুল হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী স্পষ্ট করেছেন, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা এবং একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা ছাড়া দুই দেশের সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ বরফ কিছুটা গলেছে, কিন্তু অবিশ্বাস কাটেনি। দুই দেশই বুঝেছে, প্রতিযোগিতা থাকলেও পাশাপাশি থাকতেই হবে। কোথাও সংঘাত, কোথাও প্রতিযোগিতা, আবার কোথাও সীমিত সহযোগিতা-এই বাস্তবতাই আগামী দিনে ভারত-চিন সম্পর্কের মূল চরিত্র হতে পারে।

তা হলে কি শিবির বদলাচ্ছে ভারত?

উত্তর একেবারেই স্পষ্ট-না।

দিল্লিতে মোদী, পুতিন ও শি জিনপিংকে পাশাপাশি দেখা গিয়েছে। তাঁদের বৈঠক হয়েছে, উষ্ণতার ছবিও সামনে এসেছে। কিন্তু সেখান থেকে ভারতের কূটনৈতিক শিবির বদলের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল।

ভারত কোনও একটি শিবির ছেড়ে অন্য শিবিরে যাচ্ছে না। বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত পরিসর বাড়াচ্ছে।

ব্রিকস ভারতকে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও চালিয়ে যেতে পারে নয়াদিল্লি।

এই ভারসাম্য নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু বৃহৎ শক্তি হিসেবে ভারতের সামনে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল।

আসল পরীক্ষা ২০২৭-এ

দিল্লির সম্মেলন শেষ হয়েছে। কিন্তু ভারতের সামনে বড় পরীক্ষা এখনও বাকি। আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতিত্ব থাকবে চিনের হাতে।

বেজিং আরও সম্প্রসারিত ব্রিকস, শক্তিশালী রাজনৈতিক সমন্বয় এবং পশ্চিমি আর্থিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে চাপ দিতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার, বৈশ্বিক দক্ষিণের অধিক প্রতিনিধিত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থে ভারত চিনের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই একসঙ্গে হাঁটতে পারে।

কিন্তু ব্রিকসকে যদি চিনের নেতৃত্বাধীন একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক মেরুতে পরিণত করার চেষ্টা হয়, তখনই নয়াদিল্লির আসল পরীক্ষা। ভারতকে তখন ঠিক করতে হবে-কোন জায়গায় সহযোগিতা করবে, আর কোন জায়গায় স্পষ্ট আপত্তি জানাবে।

সেখানেই বোঝা যাবে দিল্লিতে তৈরি করা ভারসাম্য কতটা টেকসই।

আপাতত অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট। অস্থির এবং বহুমেরু বিশ্বে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনও নির্দিষ্ট জোটের প্রতি আনুগত্য নয়। তার আসল শক্তি হল নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা।

দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন সেই কৌশলগত স্বাধীনতাকে আরও কিছুটা প্রসারিত করেছে। এটাই সম্ভবত এই সম্মেলন থেকে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman