Dailyhunt
দাসত্ব দহন ও মৃত্যু

দাসত্ব দহন ও মৃত্যু

মহম্মদ শাহাবুদ্দিন

সেদিন ছিল মধ্যমাঘের নিশুতি রাত। সকালটা ছিল জানুয়ারির ২৬। গণতন্ত্রের অধিকার পাওয়ার এই দিনে উড়েছিল আমাদের গর্বের তেরঙা পতাকা। এই দিনেই শীত ঝিমানো রাতের অন্ধকারে জ্বলে উঠল এক মোমো কোম্পানির গোডাউন। মালিকের সম্পদ চুরি হওয়ার ভয়ে সে কারখানা থাকে তালাবন্দি। ভেতরে থাকে কর্মচারীরা।

শোনা যাচ্ছিল, দাউ দাউ আগুনে জ্বলতে থাকা মানুষের মরণ চিৎকার। গুদামে আটকে থাকা কারও শেষ ফোন এসেছে পরিজনদের ফোনে, বেরোনোর রাস্তা নেই। আমাদের বাঁচাও। এই জতুগৃহ হয়ে ওঠা শ্রম কারাগারে গ্রাম থেকে আসা শ্রমিক মানুষগুলো শরীরপাত করে দু-পয়সা করে খেত। তাদের শ্রম শোষণের শেকল এত শক্ত হবে প্রথমে হয়তো তাঁরা বুঝতে পারেননি। বুঝে ওঠেননি দাসত্বের জীবন এত যন্ত্রণাময় হবে। তাঁদের ঝলসানো অস্থি দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করে গেলেন জীবন্ত মৃতদেহের মতো তাঁরা কেমন করে জীবন কাটাতো।

Advertisement

আজকের মুনাফালোভী কর্পোরেট রাজত্বে একি শুধু এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বাইপাসের ওপারে জলাজমি বুজিয়ে কত শত অবাধ নির্মাণে অসংগঠিত শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র। এই সব সংস্থায় শ্রমিকদের কতটুকু নিরাপত্তা, কতটুকু মর্যাদা? তাই তো প্রাপ্য অধিকারটুকু মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দিতে নারাজ। তাই রাতেরবেলায় নিজের মজুরদের দমকলের অনুমতির তোয়াক্কা না করে গুদামের বাইরে থেকে তাদের তালা বন্ধ করে রাখা হয়। আমরা মধ্যযুগে দাস প্রথার কথা শুনেছি। দাস মনিবের সম্পত্তি। দারিদ্র থেকে বাঁচতে গেলে দাসত্বকে বরণ করে নিতে হত। পৃথিবীর অনুন্নত দেশগুলো থেকে এখনও চলে মানব ব্যবসা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কম বেতনের চাকরিতে এখনও মানুষ পাচার হয় উপমহাদেশের দেশগুলি থেকে। সেখানে কাটাতে হয় পাসপোর্ট, ভিসা জমা রেখে বন্ডেড লেবার বা জোরপূর্বক কাজের অমানুষিক পরিশ্রমের জীবন। আমাদের শহর সংলগ্ন নাজিরাবাদে তালাবন্দি অগ্নিদগ্ধ শ্রমিকের মৃত্যু দাস মানুষের পরিণতিকেই তুলে ধরে। নিরাপত্তাহীন অসহায় মানুষের এ যেন নির্মম মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ।

Advertisement

শ্রম আইন কী বলে সেদিকে দেখা যাক। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যারা আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই, তারা এই ঘটনাটিকে, এই মৃত্যু, অগ্নিকাণ্ডকে সহমর্মিতার সঙ্গেই একদিন ভুলে যাব। কিন্তু একটি কোম্পানি আমাদের সাংবিধানিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে মুনাফা লুটবে, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। ১৯৪৮ সালের শ্রম আইন যে অধিকারগুলি দিয়েছে, তার অন্যতম হল শ্রমিক শোষণাকে নিবারণ করার অধিকার। যে অধিকারের এমন মর্মান্তিক লঙ্ঘন সহসা দেখা যায় না। ১৯৪৮-এর কারখানা আইন উন্নীত হয়েছিল শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়ে। আইনের ১১ থেকে ২০ ধারা, ২১ থেকে ৪১ ধারা এবং ৪২ থেকে ৫০ ধারায় স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা উন্নয়নের নির্দেশ লিপিবদ্ধ আছে। একথা সত্য এই নির্দেশ অনুপুঙ্ক্ষভাবে কলকারখানায় মানা হয় না। ন্যূনতম বেতন কাঠামোও শ্রম আইনে নির্ধারিত করা ছিল। এমন করে সমস্ত আইনি নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে মানব দহন দেখা যায়নি। এ শুধু অগণিত মানুষের মৃত্যু নয়, দেশের আইনের চরম অবমাননা। এই অবমাননার মর্মান্তিক উদাহরণ এই অগ্নিকাণ্ড। তাই তো জলাভূমি বুজিয়ে গড়ে ওঠা এই কর্পোরেট কারখানায় অনেক শ্রমিককে কাজ করতে ঢুকিয়ে মালিকের নির্দেশে অনায়াসে নির্গমন পথ রুদ্ধ করে দেওয়া যায়।

আমাদের রাজ্যে শিল্প অত্যন্ত প্রয়োজন, কিন্তু শিল্পের জন্য যে দ্বিতীয় প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ শ্রমশক্তি তাকে এমন নির্মমভাবে চিতার আগুনে ঠেলে দিলে শিল্প কি বাঁচে? জমি, শ্রমিক, পুঁজি ও প্রতিষ্ঠান, এই চারটি শিল্প গড়ার অন্যতম হাতিয়ার।

প্রথমটি, তৃতীয় এবং চতুর্থটি অনায়াসলব্ধ না হলেও পাওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয়টি কোথায় যাবে, যদি মানুষের অস্তিত্বটুকু শিল্প মালিকের লোভের আগুনে পুড়ে যায়। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে। যাঁরা ওই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিপিণ্ডে ছাই হয়ে গেলেন, তাঁদের প্রকৃত পরিচয় কোথায়? সেদিনকার কর্মতালিকা কোথায়?

তাঁদের মধ্যে কতজন দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমিক। আর তাঁদের নিয়োগপত্র এবং তার শর্তাবলী কী কী ছিল? তালাবন্ধ কর্মক্ষেত্রটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল। আরও প্রশ্ন উঠবে, সেখানে কী ধরনের দাহ্য পদার্থ কতটা রাখা হয়েছিল। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই রকম ভয়ঙ্কর অব্যবস্থার মধ্যে তাঁদের তালা বন্ধ করে কাজ করানোর মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো কেন?

তাঁদের কী ধরনের নিয়োগপত্র দেওয়া হতো, আমরা কেউ জানি না। এই প্রশ্নগুলি শুনে কারও বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। এই প্রশ্ন বারবার অবশ্যই উঠবে এবং তার উত্তরও আমাদের পেতে হবে। অবৈধভাবে গজিয়ে ওঠা এইসব কারখানা কতগুলি আইনসঙ্গত ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয়েছে, এই প্রশ্ন আমরা করব না? এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে দায়বদ্ধ জমির মালিক, প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং অবশ্যই প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।

এতগুলি মানুষের প্রাণ হারিয়ে গেল। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণও ঘোষণা করা হয়েছে সরকারি তরফে। কিন্তু যে শিশুটি তার পিতার ফেরার আশায় পথের দিকে চোখ মেলে আছে, তার এই আশার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ কীভাবে করা যাবে? যে পিতামাতার অন্ধের যষ্টি ভস্মীভূত হল তাদের বেদনা, তাদের জীবনের শূন্যতা কীভাবে দূর হবে?

জীবনের শুরুতে যে তরুণী বধূ একাকী হয়ে গেলেন, তাঁর যন্ত্রণার পরিমাপ করে ক্ষতিপূরণ করা যাবে তো?

দরিদ্র মানুষ নিরুপায় হয়ে হাত পেতে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করে, কিন্তু তার রক্তাক্ত হৃদয় চিরটা কাল নিরুচ্চারে চিৎকার করে বলে, কোথায় গেল আমার সে প্রিয়জন? এখন নাজিরাবাদের পোড়া কারখানার জমিতে শুধু নিভে যাওয়া আগুনের ছাই। ছাইয়ের মধ্যে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে পোড়া মানুষের হাড়। বাড়ির সেই কতদিনের চেনা মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বজন হারানোর গুমরে থাকা কান্নাও এখন ক্লান্ত। কত মানুষের মৃতদেহের কতটা অংশ পাওয়া যাবে কেউ বলতে পারছে না। এইবার পড়বে বেঁচে থাকা স্বজন মানুষের লাইন। পরীক্ষা চলবে ডিএনএ-র। সনাক্ত হবেন প্রিয়জন। তবেই পাওয়া যাবে প্রিয়জনের দেহ। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া মানুষের শরীর। চিতায় ওঠার আগেই দহনে নিঃশেষ হয়েছে যারা। ক্রেনের সাহায্যে ছাই সরিয়ে সরিয়ে এখন তারই খোঁজ চলেছে। মানুষের অন্তিম যাত্রার সমাপন তাই এখনও বাকি।

ঘটনার পর কারখানা এবং পাশের ডেকরেটরের গুদামের মালিক এবং কর্মচারীদের দু-একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হয়তো আইনের আশ্রয়ে পরবর্তীকালে নিজেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালাবে, সেখানে হয়তো নির্গমণ পথ বন্ধ থাকবে না। কিন্তু দেশের মানুষ আজ একটা একটা প্রশ্ন করছে, শ্মশানহীন, স্বজনহীন স্থানে যাঁরা অগ্নিতে নির্বাপিত হল, তাঁরা কবে বিচার পাবেন? কারখানার দরজা-তালা বন্ধ করে রাখলেও, সত্যকে তো তালা বন্ধ করা যায় না!

Advertisement

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman