Dailyhunt
পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড ভোটদানের পেছনে কী কারণ

পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড ভোটদানের পেছনে কী কারণ

জয়ন্ত রায়চৌধুরী

শ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোটে নজিরবিহীন ৯২.৮৮ শতাংশ ভোটদানকে সরাসরি রাজনৈতিক উৎসাহের প্রতিফলন বলা কঠিন। বরং এটি বিভিন্ন কাঠামোগত (structural) এবং আচরণগত (behavioural) কারণের মিলিত ফল- যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়েই দাবি করেছে যে এই উচ্চ ভোটদানের হার তাদের পক্ষেই জনসমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

Advertisement

বিজেপি বলেছে, এটি 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে সরানোর' ভোট। অন্যদিকে, তৃণমূল নেত্রী টুইট করে বলেছেন, 'আমি দেখেছি মানুষ স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে এবং বাংলাকে রক্ষা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ভোট দিতে বেরিয়েছেন।'

Advertisement

তবে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে আরও কিছু ভিন্ন কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এই উচ্চ শতাংশের পেছনে একটি পরিসংখ্যানগত কারণ আছে। প্রায় ৯.৪ শতাংশ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে- যার কারণ ডুপ্লিকেশন, স্থানান্তর (migration), এবং প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষের নাম 'বিচারাধীন' থাকা। ফলে মোট ভোটারের সংখ্যা কমে গেছে। ভোটারের সংখ্যা কমলে শতাংশ হিসেবে ভোটদানের হার স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখায়।

দ্বিতীয়ত, একধরনের 'প্রতিবাদমূলক ভোট'-এর প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। যেসব এলাকায় অনেক পরিবারের সদস্যদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে, সেখানে ভোট দেওয়া হয়ে উঠেছে এক ধরনের প্রতিবাদ- ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ জহর সরকার বললেন, 'তৃণমূলের 'বাংলার গৌরব রক্ষার ভোট' বা বিজেপির 'সরকারের বিরুদ্ধে ভোট'- এই দুই ব্যাখ্যা খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়।'

তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, 'এই সংখ্যার অর্ধেক মানুষ হয়তো মারা গেছেন, বা অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু বাকি অর্ধেক সত্যিকারের ভোটার।'

প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) হিসেবে কাজ করা এই প্রাক্তন আইএএস কর্মকর্তা আরও বলেন, 'প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ তাঁদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং প্রমাণ দিয়েছেন যে, তাঁরা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী নন। আরও প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁরা হয়তো জানতেই পারেননি যে, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে।'

এই সমস্ত কারণ একসঙ্গে মিলিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে এত বেশি ভোট পড়াকে কোনও এক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে স্পষ্ট জনমত হিসেবে ধরা কঠিন। বরং এটি প্রশাসনিক পরিবর্তন, ভোটারদের আবেগ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মিশ্র প্রতিফলন।

বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর পর যে ৯১ লক্ষ নাম বাদ গেছে, তার মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশই বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ১০টি জেলার। এর মধ্যে ছয়টি জেলায় প্রথম দফায় ভোট হয়েছে। এই সব জেলাতেই ভোটদানের হার ছিল খুব বেশি। কোচবিহারে সবচেয়ে বেশি ৯৬.০৪ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুরে ৯৪.১৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
যে দুটি জেলায় সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গেছে- মালদা ও মুর্শিদাবাদ- সেখানে যথাক্রমে ৯৪.৪৬ শতাংশ এবং ৯৩.৬১ শতাংশ ভোট পড়েছে।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ-এর প্রাক্তন প্রধান রণবীর সমাদ্দার বললেন, 'আমরা জানি, এ বার অনেক বেশি সংখ্যায় পরিযায়ী শ্রমিকরা ভোট দিতে ফিরে এসেছেন। এই জেলাগুলিতে মরসুমি কাজের জন্য বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এসআইআর-এর কারণে তাঁরা আতঙ্কিত- তাঁরা ভাবছেন, এবার ভোট না দিলে ভবিষ্যতে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।'

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, কিছুটা ভোটের উৎসাহ এসেছে সরকার-বিরোধী (অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি) বা সরকার-পন্থী (প্রো-ইনকামবেন্সি) মনোভাব থেকেও। রণবীর সমাদ্দার বলেন, 'দলগুলোর প্রচার কিছু ভোটারকে প্রভাবিত করেছে। অনেকের কাছে ভোট দেওয়া মানে শুধু সমর্থন নয়, বরং অসন্তোষ প্রকাশের একটি উপায়।'

বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবিত্তের একাংশের কাছে তৃণমূলের 'বাঙালিয়ানা' ও 'বাংলার গর্ব'-এর প্রচার গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাদের মধ্যে একটা আশঙ্কা কাজ করছে- ভাষা, সংস্কৃতি এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য ভবিষ্যতে নষ্ট হতে পারে।

অন্যদিকে, অনেকেই মনে করেন, শিল্পের অভাব এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে শ্রমিকদের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে। তাঁরা মনে করেন, সরকার পরিবর্তন হলে উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় সহায়তা বাড়তে পারে।

Advertisement

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman