Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আত্মরক্ষার পাঠও হোক বাধ্যতামূলক

পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আত্মরক্ষার পাঠও হোক বাধ্যতামূলক

কটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার মধ্যেই নিহিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একাধিক নৃশংস ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা-সহ বারুইপুরের মতো হৃদয়বিদারক অপরাধ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, কেবল কঠোর আইন বা শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগও সমানভাবে প্রয়োজন।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে মার্শাল আর্ট বা আত্মরক্ষার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। আত্মরক্ষা শুধু বিপদের মুহূর্তে নিজেকে রক্ষা করার কৌশল নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা। বর্তমানে রাজ্যের বহু বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্যারাটে ও অন্যান্য মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই আত্মরক্ষার মৌলিক কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখনও এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
অনেকের ধারণা, আত্মরক্ষার শিক্ষা মানেই শুধু মেয়েদের জন্য। বাস্তবে এই ধারণা অসম্পূর্ণ। ছেলে ও মেয়ে- উভয়েরই আত্মরক্ষার শিক্ষা প্রয়োজন। কারণ এই প্রশিক্ষণ কেবল আত্মরক্ষাই শেখায় না, এটি অন্যের প্রতি সম্মান, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে বিচক্ষণ আচরণের শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ তাদের মধ্যে এমন এক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে, যার ফলে তারা নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও সচেতন ও প্রস্তুত হতে পারে। প্রথম শ্রেণি বা অন্তত ছয় বছর বয়স থেকে ধাপে ধাপে এই প্রশিক্ষণ শুরু করা যেতে পারে। শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বৈজ্ঞানিক পাঠক্রম তৈরি করা সম্ভব। সপ্তাহে এক বা দুই দিন নিয়মিত ক্যারাটে ক্লাস, প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক নিয়োগ, শারীরশিক্ষার সঙ্গে আত্মরক্ষার পাঠ সংযুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর দক্ষতার মূল্যায়ন- এই কয়েকটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। মার্শাল আর্ট শেখার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো আত্মবিশ্বাসের বিকাশ। একজন শিক্ষার্থী যখন জানে যে, প্রয়োজনে সে নিজেকে রক্ষা করার মৌলিক দক্ষতা অর্জন করেছে, তখন তার মধ্যে অকারণ ভয় কমে যায়। সে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, নিয়মিত মার্শাল আর্ট অনুশীলন মনোযোগ বৃদ্ধি, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবোধ এবং ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে এর সুফল কেবল নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিজীবনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অবশ্যই ক্যারাটে শিক্ষা কোনো জাদুকাঠি নয়, যা সমাজ থেকে সব অপরাধ দূর করে দেবে। অপরাধ দমনে কঠোর আইন, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ অপরিহার্য। তবে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং প্রয়োজনে নিজেকে রক্ষা করার সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় মার্শাল আর্টস বা ক্যারাটে বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে জাপান হলো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
২০১২ সালে জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য 'বুডো' বা ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্টস শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের একটি বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে যুক্ত করেছে। এর অধীনে জুডো ও কেন্ডোর পাশাপাশি ক্যারাটি শেখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাপানের ওকিনাওয়া প্রদেশে, যেখান থেকে ক্যারাটের উৎস, সেখানে ১৯০৫ সাল থেকেই স্কুলগুলোতে ক্যারাটে শিক্ষার এক সুদীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে। জাপানের স্কুলগুলোতে ক্যারাটে বাধ্যতামূলক করার মূল উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক শক্তি বাড়ানো নয়, এর পেছনে গভীর শিক্ষামূলক দর্শন রয়েছে। শারীরিক সুস্থতার দিক থেকে এটি শিক্ষার্থীদের স্ট্যামিনা, ফ্লেক্সিবিলিটি এবং রিফ্লেক্স উন্নত করে। পাশাপাশি, ক্যারাটে সব সময় সম্মান বা শিষ্টাচার প্রদর্শন দিয়ে শুরু এবং শেষ হয়। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, বিনয় এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করে, যা তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। শারীরিক ব্যায়ামের বাইরে ক্যারাটে মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও‌ কিশোর-কিশোরীদের মনস্তত্ত্বের ওপর গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মানসিক নিরাপত্তা তৈরিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। প্রথমত, এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। ক্যারাটে শুধু শারীরিক আক্রমণ নয়, এটি মন ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শেখায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অহেতুক রাগ বা আক্রমণাত্মক মনোভাব কমে যায়। দ্বিতীয়ত, পড়াশোনা বা পারিপার্শ্বিক কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, ক্যারাটে তার একটি চমৎকার আউটলেট হিসেবে কাজ করে। অনুশীলনের সময় শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীরে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে উদ্বেগ কমায়। তৃতীয়ত, প্রতিটি নতুন কৌশল আয়ত্ত করা এবং নতুন বেল্ট অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়ে। এখানে সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে। অভিভাবকদের এই প্রশিক্ষণকে অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করলে এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।রাজ্যের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে ক্যারাটে বা আত্মরক্ষার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে একটি সুপরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করা হোক। সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও যেন বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। আজকের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গকে আরও নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক করে তুলতে পারে। কারণ আত্মরক্ষার শিক্ষা শুধু আত্মরক্ষার শিক্ষা নয়- এটি আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা, সাহসের শিক্ষা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার শিক্ষা।
Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman