Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
সুসংগঠিত বুথ-কৌশল, সঙ্গে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া.

সুসংগঠিত বুথ-কৌশল, সঙ্গে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া.

সুনীল মাইতি

শ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। যে রাজ্য একদা বামপন্থার দূর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তী কালে যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই বিপুল সাফল্য এক মহাকাব্যিক রাজনৈতিক উত্থান।

এই অভাবনীয় ফলাফলের পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলের শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রশ্ন উঠছে- এই জয়ের পিছনে মূল চালিকাশক্তি কোনটি? সুনীল বনসল এবং ভূপেন্দ্র যাদবের মতো কেন্দ্রীয় ভোট-কুশলীদের 'মাইক্রো লেভেল' বা নিখুঁত বুথ স্তরের সংগঠন, নাকি শাসকদলের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া? গভীর পর্যালোচনায় বসলে দেখা যাবে, এই দুই ধারার কোনোটিই এককভাবে এই সাফল্যের দাবিদার নয়; বরং একটি সুসংহত অসন্তোষকে নিখুঁত সাংগঠনিক রূপ দেওয়াই ছিল পদ্ম-শিবিরের আসল ম্যাজিক। এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে দিল্লির কেন্দ্রীয় রণকৌশল যেমন কার্যকর ছিল, তেমনি মাটির লড়াইয়ে স্থানীয় আবেগ, ভাষা ও রাজনৈতিক সমীকরণকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে রাজ্য নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারী এবং শমীক ভট্টাচার্য- এই দুই নেতার যুগলবন্দী ছাড়া সুনীল বনসল বা ভূপেন্দ্র যাদবের বুথ-কৌশলকে বাংলার মাটিতে বাস্তবায়িত করা অসম্ভব হতো।

Advertisement

সুনীল বনসল যদি বঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক ইঞ্জিনিয়ার হন, তবে শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন সেই ইঞ্জিনের প্রধান চালিকাশক্তি বা 'অন ফিল্ড ক্যাপ্টেন'। তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্থরের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপিতে আসা শুভেন্দুর অবদানকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়-
বাংলায় তৃণমূলের মত ক্যাডার-ভিত্তিক এবং শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে যে রাজনৈতিক আগ্রাসন ও সাহসের প্রয়োজন ছিল, শুভেন্দু অধিকারী তা সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শাসকদলের 'খেলা হবে' বা অন্য যে কোনও রাজনৈতিক স্লোগানকে মাঠে নেমে তীব্র প্রতি-আক্রমণে খন্ডন করার কাজটি তিনি একাই টেনেছেন।

Advertisement

শুভেন্দু দীর্ঘকাল তৃণমূলের মেদিনীপুর-সহ জঙ্গলমহল, মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের মতো জেলার পর্যবেক্ষক ছিলেন। ফলে শাসকদলের কোথায় সাংগঠনিক ফাঁক ফোকর রয়েছে, কোন অঞ্চলে কোন নেতার বিরুদ্ধে জনক্ষোভ সবচেয়ে বেশি- তা তাঁর নখদর্পণে ছিল। বনসল এবং যাদবের টিমকে এই অভ্যন্তরীণ 'ইনপুট' দিয়ে বুথ স্তরের রণকৌশল সাজাতে শুভেন্দুর এই অভিজ্ঞতা অমূল্য প্রমাণিত হয়েছে।

দক্ষিণবঙ্গ, বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গ ও জঙ্গলমহলে নিজের ব্যক্তিগত অনুগামীদের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি বিজেপির গ্রামীণ ভোট ব্যাঙ্ককে মজবুত করেছেন। চোর-মুক্ত বা দুর্নীতি-মুক্ত পঞ্চায়েতের ডাক দিয়ে গ্রামীণ স্তরের ক্ষোভকে ইভিএমে রূপান্তরের আসল কারিগর ছিলেন তিনিই।

শুভেন্দু অধিকারী যখন মাঠের লড়াইয়ে আগ্রাসী মেজাজে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন দলের অন্যতম প্রবীণ এবং পরিশীলিত মুখ শমীক ভট্টাচার্য পর্দার আড়ালে এবং সংবাদমাধ্যমের সামনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বিজেপির বিরুদ্ধে শাসক দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাদের 'বহিরাগত' বা 'অ-বাঙালি' তকমা দেওয়া। শমীক ভট্টাচার্য তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি, মার্জিত ভাষা এবং গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে সংবাদমাধ্যমের সান্ধ্যকালীন বিতর্কে সেই ন্যারেটিভকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি মননে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তাঁর এই 'ভদ্রলোক' ইমেজ অত্যন্ত কাজ করেছে।

সুনীল বনসল বা ভূপেন্দ্র যাদব যখন দিল্লির হিন্দি বলের সাংগঠনিক মডেল (যেমন 'পন্না প্রমুখ') বাংলায় প্রয়োগ করতে চাইছিলেন, তখন শমীক ভট্টাচার্য একজন ভূমিপুত্র হিসেবে সেই মডেলের সঙ্গে বাংলা রাজনীতির সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে সাহায্য করেন। দিল্লির কৌশলকে কীভাবে বাংলার মানুষের কাছে সহজপাঠ্য করে তোলা যায়, তার রূপরেখা তৈরিতে তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করেছে।

তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হওয়ায় যখন অন্যান্য দল থেকে বহু নেতা-কর্মী বিজেপিতে আসছিলেন, তখন দলের আদি ও নব্য ধারার মধ্যে কোনও বড় ধরনের সংঘাত যাতে বুথ-স্তরের কাজকে প্রভাবিত না করে, তা নিজের মৃদুভাষী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে সামাল দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য।

যে কোনও নির্বাচনে শাসকদলের বিরুদ্ধে জনমানসে তৈরি হওয়া ক্ষোভ বা 'অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি হলো বারুদের মতো। বাংলায় গত কয়েক বছর ধরে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে জনমানসে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। দুর্নীতি, স্থানীয় স্তরে তোলাবাজি, একশো দিনের কাজ বা আবাস যোজনার মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং সর্বোপরি গ্রামীণ স্তরে স্থানীয় নেতৃত্বে একাংশের ঔদ্ধত্য সাধারণ মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারগুলোর ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল। পরিবর্তনের এক অলিখিত আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল বাংলার বাতাসে। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শুধু শাসকের প্রতি রাগ থাকলেই ক্ষমতা বদল হয় না। রাগের এই বারুদকে ইভিএমে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজন হয় একটা শক্তিশালী দেশলাই কাঠি এবং দক্ষ গোলন্দাজ বাহিনীর। আর ঠিক এইখানেই প্রবেশ করেছিল বিজেপির কেন্দ্রীয় দিল্লির দুই প্রধান কারিগরের।

উত্তরপ্রদেশে অসাধ্য সাধন করার পর সুনীল বনসল যখন বাংলায় পা রাখেন, তখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল- বাংলায় বিজেপির আবেগ এবং জনসমর্থন থাকলেও, তা ভোটকেন্দ্রে ধরে রাখার মত কোনও নির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না। অন্যদিকে, ছত্তিসগড় থেকে রাজস্থান, একের পর এক রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী বৈতরণী পার করানো ভূপেন্দ্র যাদবের মস্তিষ্ক এই লড়াইয়ে যোগ করেছিল এক ভিন্নমাত্রা।

এই দুই চাণক্য খুব ভালো করেই জানতেন, বাংলার রাজনীতি দিল্লির বা উত্তর ভারতের চেয়ে আলাদা। এখানে প্রতি বুথে 'ক্যাডার' সংস্কৃতির আধিপত্য। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন বড় বড় জনসভা বা সমাজমাধ্যমে হাওয়া দিয়ে জনতাকে উদ্বেলিত করা গেলেও ভোটের দিন ভোটারকে বুথ পর্যন্ত নিয়ে আসা এবং বুথ পাহারা দেওয়ার মত শক্তি না থাকলে জয় অসম্ভব।

আমরা যদি দেখি; বিজেপির সাংগঠনিক পিরামিডটা এইরকম: কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব- রাজ্য কমিটি- জেলা- মন্ডল- শক্তিকেন্দ্র- বুথ কমিটি (পন্না প্রমুখ)।

বনসল এবং যাদবের জুটি প্রথমেই জোর দেন 'শক্তিকেন্দ্র' এবং 'বুথ কমিটি' গঠনে। আরএসএস- এর প্রচারকদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা প্রতি বুথে ১০ থেকে ১৫ জনের কমিটি গঠন করেন।
উত্তর প্রদেশ ও গুজরতের সফল মডেল 'পন্না প্রমুখ' বা ভোটার তালিকার একটি পৃষ্ঠার দায়িত্ব একজন নির্দিষ্ট কর্মীকে দেওয়ার নীতি বাংলায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে কার বাড়ির ভোট নিশ্চিত, কে দোদুল্যমান, আর কাকে বুথে নিয়ে আসতে হবে- তার নিখুঁত হিসাব চলে আসে দলের স্ক্রিনে।

ভূপেন্দ্র যাদবের নিখুঁত জাতপাত ও আঞ্চলিক সমীকরণের অঙ্ক বাংলায় মতুয়া, রাজবংশী, আদিবাসী এবং জঙ্গলমহলের কুড়মি সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে বিজেপির পক্ষে সংহত করতে সাহায্য করেছিল। টিকিট বন্টনে আবেগের চেয়ে জিততে পারার ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে- 'সংগঠন ছাড়া হাওয়া তৈরি করা যায় না, আবার হাওয়া ছাড়া সংগঠন ভোট টানতে পারে না।' বাংলায় বিজেপির সাফল্যের মূল রহস্য এই দুইয়ের রসায়ন।

যদি শুধু প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া থাকত, তবে অতীতের মতো ভোট ভাগাভাগি হয়ে বাম বা কংগ্রেসের ঝুলিতেও কিছু অংশ যেত। কিন্তু বনসল- যাদব জুটি নিখুঁত বুথস্তরের কাজের ফলে বিরোধী ভোটের সিংহভাগ বিজেপির বাক্সে এসে পড়ে। তাঁরা সাধারণ মানুষকে এই ভরসা দিতে পেরেছিলেন যে, শাসকদলের পেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো বুথ স্তরের ক্ষমতা পদ্ম-শিবিরের রয়েছে। গ্রামীণ বাংলার মানুষ যখন দেখলেন বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে বিজেপির এজেন্টরা বুক চিতিয়ে লড়াই করছেন, তখন ভয়ের দেওয়াল ভেঙে ভোট দেওয়ার সাহস পান তাঁরা।

অন্যদিকে, শুধু বুথ সংগঠন দিয়েও জয় আসতো না যদি না মাটিতে ক্ষোভের আগুন থাকত। সুনীল বনসলের তৈরি বুথ কমিটির কর্মীরা গ্রামীণ স্তরে গিয়ে আবাস যোজনার দুর্নীতি বা পঞ্চায়েতের দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হওয়াকে যদি 'কাঁচামাল' ধরা হয় তবে সুনীল বনসল ও ভূপেন্দ্র যাদবের বুথ লেবেলের নিখুঁত কাজ ছিল সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ করে চূড়ান্ত 'পণ্য' বা 'ভোট' তৈরি করার আধুনিক কারখানা।

Advertisement

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Dainikstatesman