Thursday, 16 Sep, 6.07 pm DW

দূনিযা
বর্ষায় অতিমারির দোসর পানি ও মশাবাহিত রোগ

অতিমারির জন্য বছর দেড়েক আড়ালে ছিল মশা ও জলবাহিত রোগ। কোভিডের তৃতীয় ঢেউ যখন শিয়রে, তখন ফের তারা স্বমহিমায়। বর্ষাকালই কি শুধু দায়ী, নাকি অন্য কারণও?গত দেড় বছর করোনা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল প্রশাসন। এখন তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় প্রহর গোনা চলছে। সংক্রমণের গ্রাফ ওঠানামা করলেও এখনো নাগালের মধ্যে অতিমারি। এরই মধ্যে বর্ষার শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন উপসর্গ জোরালো হচ্ছে। শহর জুড়ে কলেরা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর গ্রাফ চড়ছে বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রায় দেড় বছর বিরতির পর শহরে মশাবাহিত রোগের হামলা! বড়বাজার, কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার, ট্যাংরা, তপসিয়া প্রভৃতি এলাকায় মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।

২০১৯-এর তুলনায় এ সব এলাকায় এক লাফে রোগীর সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও দমদম বা বিধাননগর এলাকায় এ সব রোগের দাপট কম। চিন্তার বিষয়, রাজ্যে চিহ্নিত মোট রোগীর ৮০ শতাংশই কলকাতার। স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কথায়, জুন পর্যন্ত মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণেই ছিল।

বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই মাসে হঠাত্‍ ৩০০ রোগীর সন্ধান মেলে কলকাতার পাঁচটি বরোয়। যদিও আগস্টে অল্প সংখ্যক রোগীর খোঁজ মিলেছিল। সেপ্টেম্বরে তা ফের বাড়তে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় ৫০০ মিলিমিটার অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে, জল জমেছে বহু জায়গায়।

তার উপর মশা নিয়ন্ত্রণে কোনও বিশেষ পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। অনেকে বলছেন উদাসীনতা। অনেকের মতে, কোভিড নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন পুরো শক্তি ব্যবহার করায় এ দিকটা ফাঁকি পড়ে গিয়েছে। যদিও পুর প্রশাসন এই অভিযোগ মানছে না।

দমদমের মু্খ্য পুর প্রশাসক বরুণ নট্ট ডয়চে ভেলেকে বলেন, "কোভিডের পাশাপাশি আমরা নজর দিয়েছি জল ও মশাবাহিত রোগের দিকেও। অবহেলা করা হয়েছে, এই অভিযোগ ঠিক নয়। তাই আমাদের পুর এলাকায় একটি কেসও ধরা পড়েনি।” তেমন কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশে্ষজ্ঞদের বক্তব্য, গত বছর লকডাউন বিধি মেনে চলার জন্য এই সংক্রমক রোগগুলি বাড়তে পারেনি। রাজ্যের ডেঙ্গু টাস্ক ফোর্সের সদস্য ডা.

জ্যোতির্ময় পাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, "মানুষের কার্যকলাপ যত বাড়বে, জমা জল বাড়বে, ফলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হবে। এশিয়া, লাতিন আমেরিকায় ডেঙ্গু প্রতি বছর বর্ষায় হবেই। তবে এ বছর এখনো অত ভয়াবহ হয়নি। গত বছর লকডাউন ছিল বলে কনস্ট্রাকশনের কাজও বন্ধ ছিল।

জল জমতে পারেনি।” কলেরার বাড়বাড়ন্ত মশাবাহিত রোগের দোসর হয়ে শহরের কামারহাটি অঞ্চলে কলেরার অনুপ্রবেশও লক্ষণীয়! এর আগে কলকাতায় ২০১৫ সালে কলেরার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। কামারহাটি পুরকর্তাদের মতে, এক থেকে চার নম্বর ওয়ার্ড সবছেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া অনেক ওয়ার্ডেও কলেরা ছড়িয়েছে।

১৭৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি। ছাড়া পেয়েছেন ১০০ জন। প্রাথমিক চিকিত্‍সায় সুস্থ হয়েছেন শ দুয়েক মানুষ। মারা গেছেন দুজন।

তবে স্থানীয়দের মতে, মৃতের সংখ্যা ১১। এমনকি এখনো জল খেলেই ডায়ারিয়ার উপসর্গে অসুস্থ হচ্ছেন কামারহাটির বাসিন্দারা। ফোটানো জল খাওয়াই আপাতত ভরসা তাঁদের। সামর্থ্য থাকলে কেউ বা আবার বোতলের কেনা জল খাচ্ছেন।

আগের থেকে পরিস্থিতি ভালো হলেও পুরোপুরি ঠিক হয়নি। এদিকে সংক্রমণের সঠিক উত্‍স এখনও খুঁজে পায়নি পুরসভা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুরসভার পক্ষ থেকে জলাধারগুলিতে ক্লোরিনের পরিমাণ বাড়িয়েও লাভ হচ্ছে না কিছু। কামারহাটির উপ-মুখ্য প্রশাসক তুষার চট্টোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে জানান, "জলের লিকেজ থেকেই কলেরা ছড়িয়েছে।

তবে সংক্রমণ কমছে।” অনুমান করা হচ্ছে, পানীয় জলের মধ্যেই মিশেছে বর্জ্য। গোটা এলাকার পাইপলাইনে ছিদ্র দিয়ে কলেরার জীবাণু প্রবেশ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু পাইপলাইনে কোথায় ছিদ্র আছে তা এখনো জানা যায়নি। কারণ তার নকশাই হারিয়ে গিয়েছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, নিকাশির সমস্যা থাকায় বর্ষায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে জল জমে। জমা জল শত্রু এই জল জমাই আদতে মশা ও জলবাহিত, উভয় রোগের উত্‍স। বেশ কিছু ক্ষেত্রে কোভিড সংক্রমণের দোহাই দিয়ে পুরকর্মীদের জমা জলের নজরদারিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই দেশের মহামারী আইনের উল্লেখ করে পুরসভার মুখ্য প্রশাসক ফিরহাদ হাকিম পুরকর্মীদের জমা জল পর্যবেক্ষণে বাধা দিলে গ্রেপ্তারের কথা বলেছেন।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সিদ্ধার্থ জোয়ারদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, "বৃষ্টির সঙ্গে মশাবাহিত এবং জলবাহিত রোগের একটা যোগসূত্র আছেই। বর্ষার সঙ্গে জল জমার সম্পর্ক আছে, জমা জলেই মশা ডিম পাড়ে। আবার দূষিত জমা জল উপচে যদি পানীয় জলের সঙ্গে কোনোভাবে মিশে যায়, তাহলে ডায়েরিয়া, কলেরা, আমাশা ইত্যাদি হয়।” কিন্তু গত বছর বর্ষায় এসব কিছুরই উপস্থিতি টের পাওয়া যায়নি। এর কারণটা কী?

ডাব্লুএইচও-র প্রাক্তন পরামর্শদাতা ও ভাইরোলজিস্ট ডাঃ অমিতাভ নন্দী বলেন, "আসলে প্রতিবছর ডায়রিয়া, কলেরা গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে জল থেকেই হয়। কিন্তু গতবার প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি গড়ে ওঠার কারণে মশাবাহিত রোগ বেশি হয়নি। এবার বেশি হচ্ছে, কারণ প্রাকৃতিক ইমিউনিটি ফের কমেছে। এভাবেই কোনোবছর বেশি, কম হবে।” ম্যালেরিয়াতে ড্রাগ রেজিস্ট্যেন্স হয়েছে এবার, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
Dailyhunt
Disclaimer: This story is auto-aggregated by a computer program and has not been created or edited by Dailyhunt. Publisher: DW (Bangla)
Top