দেড় লাখ মানুষের দেশ বিশ্বকাপ খেলছে। ১৪৭ কোটি মানুষের দেশ কেন বিশ্বকাপে নেই?বিশ্বকাপ ফুটবলে এবার একাধিক ছোট দেশ চমক দিচ্ছে। শনিবার ভোরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে দারুণ বেগ দিয়েছে কেপ ভার্দে। এমন স্বল্প পরিচিত, ছোট ছোট দেশ বিশ্ব ফুটবলের সেরা আসরে পৌঁছে গেলেও কোথায় পিছিয়ে পড়ছে ভারতের মতো জনবহুল দেশ?
গ্রুপ পর্বে স্পেন আর উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করার পর রাউন্ড অব ৩২-এ তারা আর্জেন্টিনাকে পর্যন্ত জয়ের জন্য এক্সট্রা টাইম পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপ কুরাসাও আরও ছোট। দেড় লাখেরও কম মানুষের এই দেশ কনকাকাফ বাছাই পর্বে জ্যামাইকার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে আসে। গ্রুপ ই-তে আইভরি কোস্টের কাছে ২-০ গোলে হেরে তাদের যাত্রা গ্রুপ পর্বেই শেষ হয়ে যায়।
অবশ্য এত অল্প জনসংখ্যার দেশের বিশ্বকাপের মূল পর্বে যোগ্যতা পাওয়াই বড় অর্জন। এশিয়া থেকেও দুটো নতুন দল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার জর্ডান এশিয়ান কাপের ফাইনাল খেলার পরে এবারই প্রথম বিশ্বকাপের টিকিট পায়। ওমানের বিপক্ষে ৩-০ জয়ের মাধ্যমে তারা মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত করে।
অধিনায়ক মুসা আল-তামারি ফ্রান্সের লিগ ওয়ানে খেলেন। তিনিই দলের মূল ভরসা। উজবেকিস্তান ১৯৯৪ সালে ফিফায় যোগ দেওয়ার পরে আটবার চেষ্টার পর সফল হয়েছে। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে তারা প্রথম মধ্য এশিয়ার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়।
আইভরি কোস্ট আর বসনিয়া আগেও বিশ্বকাপ খেলেছে। সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার আইভরি কোস্ট ছোট আকারের দেশ হলেও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। আইভরি কোস্ট ২০০৬ সালেই প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ২০১৪-র পরে আবার বিশ্বকাপে এসেছে।
মাত্র ৩১ লাখ জনসংখ্যার দেশটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও উঠেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে পঞ্চম ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নকআউট খেলার রেকর্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারত ফিফার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারত ১৩৮তম স্থানে রয়েছে। তাদের সেরা র্যাঙ্কিং ছিল ৯৪তম, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। অর্থাৎ কখনোই বিশ্বাকাপের স্তরে খেলার প্রয়োজনীয় মানে উন্নীত হতে পারেনি ভারত যদিও অতীতে নজরকাড়া সাফল্য পেয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের প্রধান সাফল্যগুলো মূলত ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের স্বর্ণযুগে। ১৯৫১ সালে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান গেমসে ইরানকে ১-০ গোলে হারিয়ে ভারত প্রথম স্বর্ণপদক জেতে। সেই ইরান এবার বিশ্বকাপ খেলেছে। এর ঠিক ১১ বছর পরে ১৯৬২ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে ভারতীয় দল দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ার সেরার মুকুট মাথায় পরে।
এই দেশটি এখন বিশ্বকাপের মূল পর্বে প্রতিবারই জায়গা করে নেয়। এর মধ্যে ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করে ভারত, যা অলিম্পিকের ইতিহাসে সেমিফাইনালে পৌঁছানো এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে। অস্ট্রেলিয়া এবারের বিশ্বকাপে নকআউট পর্যায়ে খেলেছে। এই স্বর্ণযুগের শেষ বড় সাফল্য আসে ১৯৬৪ সালের এএফসি এশিয়ান কাপে, যেখানে এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে ভারত রানার্সআপ হয়।
কিন্তু এরপর থেকে ফুটবলে আর এগোতে পারেনি দেশটি। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা সাবেক ফুটবলার থেকে কোচ, ভারতের ফুটবলে পিছিয়ে পড়ার জন্য সকলেই পরিকল্পনার অভাবকে দায়ি করছেন। জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সৈয়দ রহিম নবী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘বিশ্বকাপ খেলতে হলে কেন্দ্রীয় স্তরে পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের দেশে কোনো বিশ্বমানের ফুটবল অ্যাকাডেমি আছে কি?
তৃণমূল স্তরের ফুটবলার তুলে আনার কোনো পরিকল্পনা আছে? গ্রামে গ্রামে যেসব ক্লাব রয়েছে, তাদের ফুটবল খেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাজনীতির জন্য আমাদের খেলার জগৎ শেষ হয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলো একটা পবিত্র জিনিস।
এর মধ্যে রাজনীতি না থাকাই উচিত। খেলাকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে।’’ নবীর বক্তব্য, ‘‘ফুটবলার তুলে আনার জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ক্রিকেটে যে সুবিধা দেয়া হয়, সেটা ফুটবলের ক্ষেত্রে হয় না। তাহলে কেন বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে ফুটবল প্র্যাকটিস করাতে যাবে।
টিভিতে কুড়িটা বিজ্ঞাপন হলে, সবকটিতেই দেখা যায় ক্রিকেটাররা মডেল হয়েছেন। ফুটবলারদের কি মডেল করা হয় বিজ্ঞাপনে? টিভি খুললে অভিভাবক থেকে ছেলেমেয়েরা শুধু ক্রিকেটারদের দেখছেন টিভিতে। শুধু শারীরিক সক্ষমতার কথা বললে হবে না।
মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমি অস্ট্রেলিয়া, জর্ডনের বিরুদ্ধেও খেলেছি। তারা আজ বিশ্বকাপ খেলছে। আর আমরা কোথায়!’’ মোহনবাগান ফুটবল ক্লাব এবং ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাব- কলকাতার দুই বিখ্যাত ক্লাবের অধিনায়কত্ব করা সাবেক ফুটবলার ও বর্তমান কোচ দীপেন্দু বিশ্বাস ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমাদের একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে শুরু করতে হবে।
স্কুলে স্কুলে ফুটবল খেলায় উৎসাহ জোগাতে হবে। আমাদের উচ্চমানের অ্যাকাডেমি নেই। বিদেশে ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে ছেলেরা অ্যাকাডেমিতে খেলাধুলো করে। তারা পরে খেলে বড় দলে।
এভাবে ফুটবলার তুলে আনতে হবে। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তাই বিশ্বকাপ খেলব বললেই খেলা যায় না।’’ ওই দুই ক্লাবের সাড়া জাগানো ফুটবলার মেহতাব হোসেন ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করা নেই। বিশ্বকাপ খেলব, এই গোলটাই আমাদের সেট করা নেই।
একেবারে ছোট বয়স থেকে বাচ্চাদের তৈরি করতে হবে। আট বছর বয়স থেকে প্র্যাকটিস করাতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব এমন মডেল তৈরি করেছিল। তারাও তো এশিয়ার দেশ।’’ শুধু অ্যাকাডেমি করলেই সমাধান হবে বলে মনে করেন না মেহতাব।
তার মতে, ‘‘একশটা অ্যাকাডেমি বা কোচ তৈরি করলেই ফুটবলার গড়ে উঠবে না। একেবারে বিজ্ঞানসম্মত উপায় এগোতে হবে। এরমধ্যে আমাদের আবহাওয়া, ফুটবলারের শারীরিক গঠন, তার জিনের চরিত্র, সব বিশ্লেষণ করে ফুটবলারদের চিহ্নিত করতে হবে। আমার শিশুর কী দরকার, কোন খাবার দরকার, কতটা প্রশিক্ষণ দরকার, এটা ঠিক করতে হবে।
আফ্রিকানরা যেমন জন্মগতভাবেই খুব শক্তপোক্ত শরীরের অধিকারী। আমাদের সেক্ষেত্রে খামতি রয়েছে। দেখতে হবে যে, সেই খামতিগুলি কীভাবে আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। এর জন্যই দরকার বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা।’‘ এই সময়ের তারকা ফুটবলার, ভারতীয় জাতীয় দলের ডিফেন্ডার প্রীতম কোটাল ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমাদের পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, একথা বলতে পারব না।
কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক লক্ষ্যে এগোনোর দিকে ঘাটতি রয়েছে। ছোট থেকে একটি গাছকে যখন বড় করা হয়, তখন সেটির অনেক ধরনের পরিচর্যা দরকার হয়। এক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। ফুটবলারদের ছোট থেকে পরিচর্যা করতে হবে।’’ তার বক্তব্য, ‘‘বিশ্বকাপ এলেই আমাদের মনে পড়ে, কেন ভারত এই টুর্নামেন্টে খেলছে না।
বিশ্বকাপ আসার অনেক আগে থেকেই আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা আগামী ১০ বা ১৫ বছরে কোনো একটা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। সেজন্য ধাপে ধাপে এগোতে হবে। হঠাৎ করে কিছু হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।’’
