বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নিলেও ডনাল্ড ট্রাম্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আছে বিশ্বকাপে। খেলার মাঠে নেই, আছে জমজমাট বিতর্কের মঞ্চে।বিতর্কের শুরু রাউন্ড অফ ৩২-এ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ থেকে। সেই ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন ব্যালোগান।
ইনফান্তিনোকে ট্রাম্প ফোন করেছিলেন, কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মনে হয়েছে, ব্যালোগানকে লাল কার্ড দেখানোর ঘটনাটি আসলে ‘‘কোনো ফাউল ছিল না।'' ট্রাম্পের ফোনের পর ব্যালোগানের সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হয়ে যায়। এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। বিতর্ক এখনো চলছে। যত বিতর্কই হোক, ফিফা ব্যালোগানকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে দেয়ায় ট্রাম্প খুবই খুশি।
বেলজিয়াম-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের আগে এ বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘‘আমার মনে হয় এটা (সাময়িক নিষেধাজ্ঞা) একটা বড় দাগ ফেলে যেতো। তারা (ফিফা) কী করবে তা আমি বলে দিতে পারি না। আমি মনে করি না যে সিদ্ধান্তটি তারাই নিয়েছে। আমার ধারণা, কমিশনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর সেটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।'' বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের দু’দিন আগে ব্যালোগানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় ফিফা। নিজের ট্রুথ সোশাল প্ল্যাটফর্মে ফিফার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প লেখেন, ‘‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অবিচারের বিপরীত অবস্থান নেয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!'' প্রসঙ্গত, ট্রাম্প এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সম্পর্ক খেলাধুলার অঙ্গনে আগে থেকেই বহুল আলোচিত। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার' দিয়ে সমালোচিতও হয়েছেন ইনফান্তিনো। তবে ট্রাম্পের ফোনের পর ব্যালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও ফিফা প্রেসিডেন্টের দাবি, ফিফার বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্যালোগানের ওপর লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ট্রাম্প যে ফোনে এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন তা ইনফান্তিনোও অস্বীকার করেননি। তবে তার দাবি, ফোনে ট্রাম্পকে তিনি জানিয়েছিলেন যে, ব্যালোগানের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফিফা সভাপতির এমন ব্যাখ্যা সমালোচনার ঝড় থামাতে পারেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয়ার আগে এ ম্যাচে ব্যালোগানের খেলার ‘যোগ্যতা’ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল রয়েল বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ)।
ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে ব্যালোগানের খেলা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিল তারা স্পষ্ট ভাষায়। গত রোববার এক বিবৃতিতে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে আরবিএফএ জানিয়েছিল, এ সিদ্ধান্তে তারা ‘হতবাক'। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষের ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘‘ফিফার কাছে ৫ জুলাই আর ১ এপ্রিল (এপ্রিল ফুলস ডে) যে একই বিষয় তা আমি জানতাম না।'' যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো অবশ্য মনে করেন, পুরো বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি হয়েছে, কারণ, ‘‘বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে ৩০ বা ৩৫ মিনিট'' খেলেছে তার দল। তিনি বলেন, ‘‘এমন তো নয় যে আমরা এতে লাভবান হচ্ছি।
শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো ভুক্তভোগী নই, কিন্তু এই গল্পের খলনায়কও আমরা নই।'' ফুটবল-সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন খেলোয়াড়ের শাস্তি এভাবে স্থগিত করা মোটেই ঠিক হয়নি। এই পদক্ষেপের জন্য ফিফা সভাপতি এবং ডনাল্ড ট্রাম্পকেই দায়ী মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে বেলজিয়ামের অবস্থানকে ইতিমধ্যে সমর্থন জানিয়েছে উয়েফা। সোমবার এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ফিফার এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি ‘সীমা লঙ্ঘন'-এর পর্যায়ে পড়ে।
ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করা নরওয়ের কোচ স্টালে সলবাকেন মনে করেন, ‘‘এটা (নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা) ফিফার বড় একটা ভুল। এটা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। ও (ব্যালোগান) লাল কার্ড পেয়েছিল। ভিএআর-ও নিশ্চিত করেছিল যে সেটা লাল কার্ডই ছিল।
এর অর্থ হলো, ওকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হতে হবে।'' নরওয়ের কোচ আরো বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ দিকটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র বেলজিয়ামকে হারিয়ে দিলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বা অস্বস্তি থেকেই যাবে। বেলজিয়ামের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা তাতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হবেন।'' জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি)-র প্রেসিডেন্ট বার্নড নয়েনডর্ফ-ও এ বিষয়ে সোচ্চার। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এমন এক বিষয়ে ফিফা সভাপতিকে ফোন করায় ‘‘খেলাধুলায় প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের যে ধারণা তৈরি হয়েছে তা দ্রুত দূর করা উচিত, কারণ, এর ফলে প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা ও ফিফার বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল প্রশ্ন রেখেছেন, ‘‘এর শুরু কোথায় এবং শেষ কোথায়?
আমরা কি সিদ্ধান্ত উল্টে দিতে পারবো, নাকি পারবো না? আসলে কী ঘটছে? প্রশ্ন হলো, সীমারেখাটা কোথায় টানা হবে?'' নরওয়ের কোচ স্টালে সলবাকেনের আশঙ্কা ছিল বেলজিয়ামকে যুক্তরাষ্ট্র হারিয়ে দিলে ট্রাম্পের ফিফা সভাপতিকে ফোন করা এবং তারপর যুক্তরাষ্ট্রের এক খেলোয়াড়ের লাল কার্ডের শাস্তি স্থগিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আরো তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বেলজিয়ামকে হারাতে পারেনি।
তবে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সহ-আয়োজকরা ১-৪ গোলে বেলজিয়ামের কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পরও বিতর্ক থামেনি। ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পরাজয়কে ‘প্রকৃতির বিচার' বলে বরং বিতর্কের আগুনে নতুন ঘি ঢেলেছেন বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার নিকোলাস রাসকিন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘আগেই বলেছি, আমার মনে হয় জীবনে কোথাও-না-কোথাও সব সময়ই একটা বিচার থাকে। এ ধরনের ঘটনার যেমন ব্যাখ্যাই করা হোক না কেন আমরা মনে করি না তা ন্যায্য ছিল।'' যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার পর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে গোল উদযাপনের একটি ছবি পোস্ট করে রেড ডেভিলরা লিখেছে, ‘‘ওভারটার্ন দিস!'' বিদ্রুপাত্মক এ চ্যালেঞ্জে বার্তাটা খুব স্পষ্ট - ‘‘লাল কার্ডের সাজা তো স্থগিত রেখেছো, পারলে ম্যাচের এই ফলাফলও উল্টে দেখাও।'' এসিবি/ জেডএইচ (ডিডাব্লিউ, এপি, এএফপি, ডিপিএ, রয়টার্স)

