নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা: দেড় যুগ আগে ২০০৮ সালে অভাবের তাড়নায় স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকায়। জন মজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। স্ত্রী কাজ করতেন একটি পোশাক কারখানায়। সংসারের চাকা সচল রাখতে ব্যস্ত থাকা আলমগীরের জীবনেই একদিন নেমে এসেছিল অন্ধকার।
নভেম্বর মাসে ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে ওঠানোর পর তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত একটি স্থানে উঁচু প্রাচীর দেওয়া এক ডেরায়। সেখানেই কেটেছে দীর্ঘ ১৮ বছর। বাড়ির সবাই ধরেই নিয়েছিলেন বেঁচে নেই আলমগীর। তাই দীর্ঘ দেড় বছর বাদে তাকে দেখতে পেয়েই ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিলেন পরিজনরা। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়ে অনেকে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর। ২০০৮ সালে ঢাকায় যাওয়ার পরে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার পরে দীর্ঘদিন খোঁজ করেও স্বামীর সন্ধান না পেয়ে তার স্ত্রী আমেনা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। একমাত্র মেয়ে খাদিজা বেগম পরিচারিকার কাজ করে বড় হয়েছেন। পরে তারও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সন্তানের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পাঁচ বছর আগে মারা যান আলমগীরের বাবা-মা। ছেলের ফিরে আসার খবর তারা আর শুনতে পারেননি। বর্তমানে আলমগীরের সংসারে রয়েছেন শুধু এক ভাই, তিনিও নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত।
বাড়ি ফিরে বাবা-মা-স্ত্রী-মেয়েকে না দেখতে পেয়ে ভেঙে পড়েছেন আলমগীর। কথায়-কথায় জানালেন, '২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে ওঠানোর পর হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত এক ডেরায়। তার সঙ্গে আরও ২৯ জন ছিলেন ওই ডেরায়। প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো, কিন্তু কোনও বেতন বা ভাতা দেওয়া হতো না। পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। ভাল খাবার বলতে মাঝে মাঝে ডাল (পাতলা ঝোল) ও আলু ভর্তা। গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যায় দুষ্কৃতীরা। যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে চলে যান। বালির জাহাজে এক দিন কাজ করে ৫০০ টাকা মজুরি পেয়ে সেই টাকা দিয়েই কোনও রকমে ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভূমি পাথরঘাটায়।' বাড়ি ফিরে পড়শি আর আত্মীয়স্বজনের কাছে আলমগীর শুনেছেন, তিনি মারা গিয়েছেন ধরে নিয়ে পরিবারের তরফে বিভিন্ন সময় মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং মসজিদে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। এমনকি দরিদ্র ভোজনও করানো হয়েছিল।

