আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। তবে সময় মাঝে মাঝে এমন সব দৃশ্য তৈরি করে যা বিশ্বাস করা কঠিন। খামেনির দেহ এমন এক দেশে নিয়ে যাওয়া হবে, যে দেশের সঙ্গে ইরান আট বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। সেই দেশ হল ইরাক।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবে বর্তমান সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খামেনির দেহ ইরাকের মাটিতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সরকারি সূচি অনুযায়ী, ইরানের বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর মরদেহ ইরাকের পবিত্র শিয়া শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর ৯ জুলাই ইরানের মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের সমাগম হবে বলেই আশা করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, ইরানের নেতার মরদেহ কেন ইরাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে। নাজাফে রয়েছেন হজরত আলির মাজার, আর কারবালা হল ইমাম হুসাইনের শাহাদতের স্থান। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এই দুই শহর অত্যন্ত পবিত্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সেখানে প্রার্থনা করতে যান। ধর্মীয় আবেগ ও জায়গা দুটিকে গুরুত্ব দিয়ে খামেনির মরদেহ সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জেনে নিন ইরাক-ইরান বিরোধ সম্পর্কে…
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ইরান- ইরাক যুদ্ধকে পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলত ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের কারণে ১৯৮০ সালে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। সাদ্দাম আশঙ্কা করেছিলেন যে, বিপ্লবের আদর্শ ইরাকের শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান একটি শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ছিল এবং সাদ্দাম আশঙ্কা করতেন যে বিপ্লবের প্রভাব তার ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি শাত আল-আরব জলপথ এবং সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
সেই সময় ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা রুহুল্লাহ খামেনির হাতে ছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হয়েছিলেন এবং দেশের সামরিক বাহিনী, বিদেশনীতি ও সরকারের বিষয়ে তাঁরই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে মানা হতো। সেই সময় ইরানের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুল হাসান, যিনি ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোতে তিনি সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু ১৯৮১ সালে তাঁর এবং খামেনেইয়ের মধ্যে মতপার্থক্য চরমে ওঠে। ফলস্বরূপ তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করে ফ্রান্সে নির্বাসিত করা হয়। আট বছর ধরে উভয় দেশের সেনারা একে অপরের বিপক্ষে লড়াই করেছিল। তবে চার দশক পরে, চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। বর্তমানে ইরাকের রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব আগের চেয়েও শক্তিশালী বলে মনে করা হয়।

