নিজস্ব প্রতিনিধি, রক্সৌল: নেপালে ভয়াবহ বন্যা অনেক পরিবারকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পরিজনদের স্বজনহারা করে দিয়েছে। এমনই এক স্বজনহারা হলেন রক্সৌলের পন্টৌকা পঞ্চায়েতের ভরতহ্মির তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ধর্ম সিংহ। ছেলে রাহুল সিংহ কাজের সুবাদে গিয়েছিলেন নেপালের ত্রিশূলীতে। সেখানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত ছিলেন।
২৬ অগস্টের হড়পা বান ওই সুড়ঙ্গে ঢুকে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল। তার পর আর কোনও খোঁজ নেই রাহুলের। তাই নিখোঁজের সাতদিনের মাথায় মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় ইতি টেনে খড় দিয়ে তৈরি রাহুলের প্রকৃতি শরীরের অন্তিম সংস্কার করলেন। ছেলের মুখাগ্নি করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন হতভাগ্য ধর্ম সিংহ। বিড়-বিড় করে বলতে লাগলেন, 'ভগবান, শত্রুকেও এমন শাস্তি দিও না।'
দুবছর আগে ধুমধাম করে রাহুলের বিয়ে দিয়েছিলেন ধর্ম সিংহ। যদিও নাতি-নাতনির মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। ত্রিশূলীর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত রাহুল ফোনেই খোঁজখবর নিতেন বাবা-মায়ের-স্ত্রীর। পরিজনকে বলতেন, 'আমার জন্য চিন্তা করবে না। তোমরা নিজেদের দিকে খেয়াল রেখো।' সুখের সংসারে যে আচমকাই একদিন অমানিশা নেমে আসবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি ধর্ম সিংহ। গত বুধবার হড়পা বানে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গ ভেসে গিয়েছে তা খবরেই শুনেছিলেন। মনের কোণে একটা আশঙ্কা উঁকি দিয়েছিল। তবুও আশায় ছিলেন, হয়তো যে কোনও মুহুর্তে ছেলে রাহুল ফোন করে বলবে, 'পাপা, ম্যায় ঠিক হুঁ'।
একদিন-দুদিন-তিনদিন…এইভাবে কেটেছে সাতদিন। না এসেছে রাহুলের ফোন, না মিলেছে কোনও খবর। অপেক্ষার প্রতিটি প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে দেখা দিচ্ছিল ধর্ম সিংহের কাছে। সাতদিনেও রাহুল না ফেরেনি। কোনও খোঁজও মেলেনি। তাই হিন্দু রীতি মেনেই বুধবার সাত রাজার ধন এক মানিকের মুখাগ্নি করেছেন ধর্ম সিংহ। আর ওই দৃশ্য গোটা গ্রামের মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছিল। রাহুলের কাকা বিশ্বম্ভর সিংহ জানিয়েছেন, 'হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির মৃতদেহের সন্ধান না মিললে, সাতদিনের মাথায় খড় দিয়ে প্রতীক শরীর গড়ে অন্তিম সংস্কার করতে হয়। সেই রীতি মেনেই রাহুলের অন্তিম সংস্কার করা হয়েছে।' নেপালে কাজে গিয়ে স্বামীর আচমকা 'নেই' হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না রাহুলের স্ত্রী। স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পর বার বার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন। একটানা বিলাপ করে চলেছেন, 'নেপাল কা পানি হামরা রাজা কো খা গইল…'। ওই বিলাপ শুনে চোখের জল ধরে রাখা সত্যিই কষ্টকর।

