এই সময়: দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কালবৈশাখী এক দিকে তীব্র গরম থেকে স্বস্তি আনলেও, অন্য দিকে ডেকে আনল চরম বিপর্যয়। শুক্রবার দুপুরের আচমকা ঝড়বৃষ্টিতে বজ্রাঘাতের জেরে পুরুলিয়া জেলায় তিন জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও দু'জন। তবে এই বৃষ্টি কোথাও যেমন জমা জলের দুর্ভোগ তৈরি করেছে, তেমনই আমন ধান ও আনাজ চাষের ক্ষেত্রে বড়সড় আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
পুরুলিয়ায় বজ্রাঘাতে তিন মৃত্যু
শুক্রবার বেলা ১০টার পর থেকেই পুরুলিয়া শহর সমেত আদ্রা, হুড়া ও কাশীপুরে দেড় ঘণ্টা ধরে প্রবল কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি হয়। ঝড়ে বহু জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপড়ে যায় গাছ। এই দুর্যোগে জেলার পৃথক তিনটি এলাকায় বাজ পড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দু'জন। পুলিশ জানিয়েছে, এ দিন বাজ পড়ে মৃত্যু হয়েছে সাঁতুড়ি থানার কাঁকুড়কিয়ারি গ্রামের চৈতন ধীবর (৫৬) নামে এক ব্যক্তির। তিনি সাইকেলে যাওয়ার সময়ে আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। বাজ পড়ল লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে মুরাদ্ড্ডি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে জানান। এ দিন দুপুরে পুরুলিয়া মফস্সল থানার হাতোয়াড়া গ্রামে বাজ পড়ে প্রাণ হারান শেখ রহমতুল্লা (২৮) নামে এক যুবক। তিনি গ্রামের পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে বাজে আহত হয়ে পুকুর পাড়েই সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। স্থানীয়রা তাঁকে পুরুলিয়া মেডিক্যালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এ দিকে, বরাবাজার থানার পলমা গ্রামে বাজ পড়ে মৃত্যু হয় নিমাই গরাই (৪৬) নামে এক ব্যক্তির। এ দিন নিমাইয়ের সঙ্গে এই গ্রামেরই প্রভাত মাহাতো ও ডাক্তার গরাই নামে আরও দু'জন গ্রামে গাছ কাটার কাজ করছিলেন। ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে তাঁরা একটি চালার নীচে আশ্রয় নেন। বাজ পড়লে তাঁরা তিন জনই লুটিয়ে পড়েন। তাঁদের পুরুলিয়া মেডিক্যালে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসকরা নিমাইকে মৃত বলে জানান।
আসানসোলে জলমগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা
টানা এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকায় হাঁসফাঁস করছিল শিল্পাঞ্চলবাসী। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে চিত্তরঞ্জন ও আসানসোল শিল্পাঞ্চল জুড়ে প্রায় দু'ঘণ্টা ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ মিলিমিটার। তবে এই বৃষ্টি আসানসোলের হটন রোড, রামকৃষ্ণ ডাঙাল ও ডিপোপাড়া রেল টানেল সমেত বিস্তীর্ণ এলাকাকে জলমগ্ন করে তোলে। হটন রোড এলাকার বাসিন্দা সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'সামান্য বৃষ্টিতেই এই অবস্থা হয়। রাস্তার জমা জলে যানবাহন চললে সেই জল স্থানীয়দের ঘরে ঢুকে যায়।' বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুরসভা নিয়মিত নালা সাফাই না-করায় এই দুর্ভোগ। যদিও সাফাই দপ্তরের মেয়র পারিষদ মানস দাস জানান, নিকাশিতে কোনও গাফিলতি নেই, দ্রুত কর্মী নামিয়ে জল নামানো হয়েছে। অন্য দিকে, ঝড়ে গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল শিল্পাঞ্চল।
বাঁকুড়ায় গরমে মিলল স্বস্তি
তীব্র দহনজ্বালার পর শুক্রবার দুপুরের বৃষ্টি বাঁকুড়াবাসীকে বড় স্বস্তি দিয়েছে। বেলা ১২টার মধ্যেই আকাশ কালো করে জেলা জুড়ে বেশ কিছুক্ষণ মুষলধারে বৃষ্টি হয়। জেলা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত জেলায় ২৮.৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির জেরে বাঁকুড়ায় এ দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেমে আসে ৩৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম।
কালনায় চাষিদের মুখে হাসি
পূর্ব বর্ধমান জেলায় শুক্রবার বেলায় এবং বিকেলে দুই পশলা ভারী বৃষ্টি হয়। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে বর্ধমান শহরে কিছু জায়গায় জল জমে। সাময়িক জল জমলেও এই বৃষ্টি মূলত চাষের কাজে ব্যাপক উপকার এনেছে। কালনার বগপুরের চাষি কামাল মণ্ডল বলেন, 'দমকা হাওয়ায় আনাজের মাচা কিছুটা হেললেও তীব্র রোদে শুকিয়ে যাওয়া আনাজ চাষের জন্য এই বৃষ্টি সঞ্জীবনী।' আর এক চাষি সুমন মণ্ডল জানান, আর কিছুদিন পরেই আমন চাষ শুরু হবে। যাঁরা আগেভাগে বীজতলার কাজ শুরু করে দিয়েছেন, তাঁদের জন্য এই বৃষ্টি অত্যন্ত লাভদায়ক হবে।

