সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে প্রায় দুই দশক আগে বামফ্রন্টের জনমুখী ও দূরদর্শী প্রকল্পকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মাশুল আজও গুনতে হচ্ছে ধূপগুড়ি পৌরসভার আপামর জনসাধারণকে। ধূপগুড়ি পৌরসভা এলাকায় সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট চালু করা নিয়ে নতুন করে তীব্র জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ, আতঙ্ক ও আপত্তির জেরে আপাতত সম্পূর্ণ থমকে রয়েছে এই প্রকল্পের কাজ।
শনিবার সকালে ধূপগুড়ি পৌরসভার ১৬ নং ওয়ার্ডের স্টেশন সংলগ্ন বাম আমলে প্রস্তাবিত বৈজ্ঞানিক উপায়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ড প্রকল্প এলাকায় আবর্জনার গাড়ি এলে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় জনগণ। তাঁরা আবর্জনা ফেলতে সরাসরি বাধা দেন। গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত আবর্জনাবাহী গাড়ি ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় পৌর কর্তৃপক্ষ। রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পালা বদল ঘটলেও, ধূপগুড়ির এই দীর্ঘদিনের নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির কোনো দিশা মিলছে না।
এদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পৌর প্রশাসক তথা মহকুমা শাসক শ্রদ্ধা সুব্বা জানান, পৌরসভার পক্ষ থেকে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিটটিকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা এতে তীব্র আপত্তি জানান। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা- এখানে কোনো বৈজ্ঞানিক প্ল্যান্ট নয়, বরং ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে গোটা এলাকায় দূষণ ও দুর্গন্ধ ছড়াবে।
যদিও মহকুমা শাসকের দাবি, বাসিন্দাদের এই ধারণা ভুল। এটি কোনো ডাম্পিং সাইট নয়, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে এখানে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করা হবে। প্রাথমিকভাবে এখানে প্লাস্টিক আলাদা করে ঝুমুরস্থিত মূল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইউনিটে পাঠানো হবে এবং বাকি জৈব বর্জ্য থেকে উন্নতমানের জৈব সার তৈরি হবে। তবে মহকুমা শাসক পরোক্ষে স্বীকার করে নেন যে, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে স্থানীয় মানুষের মনে যে ডাম্পিং গ্রাউন্ডের ভীতি তৈরি হয়ে রয়েছে, তা প্রশাসন সঠিকভাবে দূর করতে পারেনি। এর আগে ২০১৩ সালেও তৎকালীন জলপাইগুড়ির মহকুমা শাসক এসে এই জট কাটানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ধূপগুড়ির এই আবর্জনা সমস্যা থেকে মুক্তির স্থায়ী উপায় আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগেই করে রেখেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত পৌর বোর্ড। ইতিহাস বলছে, ২০০৭ সালে বাম পৌর বোর্ডের আমলে ধূপগুড়ি রেল স্টেশন সংলগ্ন ১৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এই পুকুরসহ প্রায় সাত একর জমি কেনা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক উপায়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ড গড়ে তোলার জন্য সমস্ত পরিকাঠামোও প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু তৎকালীন সময়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিল তৃণমূল। সাধারণ এক শ্রেণির মানুষকে ভুল বুঝিয়ে, উসকানি দিয়ে বামফ্রন্টের সেই সাধু উদ্যোগকে স্তব্ধ করে দেয় তারা।
প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বুবাই হোসেন ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "আমরা গত কুড়ি বছর ধরে আতঙ্কের মধ্যে বাস করছি। প্রশাসন মুখে বলছে বৈজ্ঞানিক প্ল্যান্ট, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা এখানে স্রেফ শহরের নোংরা এনে ফেলা হবে। যদি সত্যিই বৈজ্ঞানিক উপায়ে করার ইচ্ছা থাকতো, তবে ২০০৭ সালে বাম আমলে এই বিশাল জমি কেনা হয়েছিল, সেই দিনই তো এটা করা যেত। তৎকালীন বিরোধী তৃণমূল সেদিন সেই প্রকল্প বন্ধ করল, আর আজ এতদিন পর জনবসতিপূর্ণ এলাকায় জোর করে আবর্জনা ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা এই নরকযন্ত্রণা মানব না।"
২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের পর ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তেরো বছর ধূপগুড়ি পৌরসভার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পরবর্তীতে ক্ষমতা যায় মহকুমা শাসকের হাতে এবং সম্প্রতি রাজ্যে ফের রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল ঘটে। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়েও আবর্জনা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি তৎকালীন শাসকদল। কেবলই চলেছে সদিচ্ছাহীন নাটক ও টালবাহানা।
সিপিআই(এম)'র ধূপগুড়ি এরিয়া কমিটির সম্পাদক জয়ন্ত মজুমদার এই প্রসঙ্গে বামপন্থীদের গঠনমূলক ও অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, "ধূপগুড়িতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ড প্রকল্প-এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং আমরা সবসময়ই এর পক্ষে। আমাদের আমলেই এই জমি কেনা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বর্তমান প্রস্তাবিত এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠেছে। আমরা জোর গলায় বলছি যে, সাধারণ মানুষের মাথার ছাদ কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক কিছু করা আমরা সমর্থন করি না। তাই ডাম্পিং গ্রাউন্ড করার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো আপত্তি না থাকলেও, সেখানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষগুলোকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ধূপগুড়ির মানুষের স্বার্থে এবং এই সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আমাদের দল সরকারকে সমস্ত রকম সহযোগিতা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। উন্নয়নও হবে, আবার মানুষের মাথার ছাদও সুরক্ষিত থাকবে- এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাসী।"
আপাতত পৌরসভা স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তালিকা তৈরি করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পৌর কর্তৃপক্ষ খুব শীঘ্রই তাঁদের সাথে আলাদাভাবে বৈঠকে বসবে। তবে তৃণমূলের তৈরি করা দীর্ঘদিনের এই জট আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে প্রশাসন কতটা কাটাতে পারে, এখন সেটাই দেখার। শহরের আবর্জনা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাম আমলের সেই দূরদর্শী পরিকল্পনাকে দ্রুত কার্যকর করার দাবিই এখন ধূপগুড়ির সচেতন মহলে জোরালো হচ্ছে।

