চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে একের পর এক বিতর্কিত ইস্যুতে বিরোধীদের ধারাবাহিক বয়কটের মুখে পড়ে কার্যত স্তব্ধ সংসদ। ককরোচ জনতা পার্টির ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা থেকে শুরু করে অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ, একাধিক বিষয়ে মোদী সরকারকে চেপে ধরেছে বিরোধী শিবির।
উল্লেখ্য, লোকসভায় প্রশ্নোত্তরের সময়টুকুও ঠিকমতো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
এই ধারাবাহিক অচলাবস্থার মাঝেই কেন্দ্র সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'ডিলিমিটেশন বিল'। বহু প্রতীক্ষিত এই বিলে সর্বসম্মত সায় পেতেই কি শেষমেশ রণকৌশল বদলাতে বাধ্য হলো সরকার?
সংসদে জারি থাকা এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এবার সরাসরি বিরোধী শিবিরের শরণাপন্ন হলো কেন্দ্র। মঙ্গলবার সংসদ ভবনে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর দরবারে হাজির হন কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। টানা ৫০ মিনিটের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরাও। সংসদের ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গায়ের জোরে বিল পাস করানোর চেনা ছবি থেকে বেরিয়ে মোদী সরকারের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
রাজনীতির বিশেষজ্ঞদের দাবি, ডিলিমিটেশন বিলের খসড়া নিয়ে শুরু থেকেই গুরুতর আপত্তি রয়েছে বিরোধীদের। বিশেষ করে তামিলনাড়ু-সহ দক্ষিণ ও পূর্বভারতের রাজ্যগুলির আসন বিন্যাস বদল এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কেন্দ্রকে লাগাতার নিশানা করছেন মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধীরা। সরাসরি সংঘাতের পথে হেঁটে বিল পাস করানো যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই বরফ গলাতে উদ্যোগী হয় সরকার। কংগ্রেস সূত্রে খবর, রিজিজু এই বৈঠকে সরাসরি জানতে চান, ডিলিমিটেশন বিল নিয়ে বিরোধীদের মূল দাবিগুলো কী এবং ঠিক কোন শর্তে তাদের সমর্থন মিলতে পারে।
তবে ৫০ মিনিটের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বিরোধী শিবির যে খুব সহজে জমি ছাড়েনি, তাও স্পষ্ট। সূত্রের দাবি, রাহুল গান্ধী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে প্রস্তাবিত বিলে একাধিক ফাঁকফোকর ও আপত্তির জায়গা রয়েছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলির উদ্বেগের যথাযথ সমাধান না হলে এবং বিরোধী প্রস্তাবগুলি গ্রাহ্য না করা হলে বর্তমান রূপে মোদী সরকারের এই বিলকে সমর্থনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একদিকে যখন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনার টেবিল গরম, ঠিক অন্যদিকে সংসদ চত্বরে প্রতিবাদ থামাননি বিরোধী সাংসদরা। প্রেরণা স্থলের গান্ধী মূর্তি থেকে মকর দ্বার পর্যন্ত বিরোধীদের যৌথ মিছিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ।
ডিলিমিটেশন বিলের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে একজোট বিরোধী শক্তিকে সামলাতে মোদী সরকার যেভাবে আলোচনার রাস্তায় হেঁটেছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী কণ্ঠকে এড়িয়ে যাওয়া সরকারের পক্ষে আর সহজ নয়। রাজনৈতিক সমঝোতার এই নতুন চাল শেষ পর্যন্ত সংসদে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা অচলাবস্থা কাটাতে পারবে কি না, নাকি ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে শাসক-বিরোধী সংঘাত আরও চরম রূপ নেবে, তা আগামী দিনেই পরিষ্কার হবে।
-অঙ্কিতা পাল

