ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পর অবশেষে মাঠের রাজনীতিতে ফিরছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফল প্রকাশের পর দীর্ঘ ২৬ দিন কার্যত অন্তরালে ছিলেন তিনি। ঘরের ভেতরের ক্ষোভ আর বাইরের আইনি চাপ উড়িয়ে আগামীকাল, শনিবার থেকেই তিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে চলেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
ভোট-পরবর্তী হিংসায় আক্রান্ত কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেই তাঁর এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
দলীয় সূত্রে খবর, শনিবার নিজের প্রথম দফার কর্মসূচিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণ এবং কলকাতার বেলেঘাটা বিধানসভা এলাকায় যাবেন। সেখানে ভোট-পরবর্তী হিংসার শিকার হওয়া তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকার এবং বিশ্বজিৎ পট্টনায়কের বাড়ি গিয়ে তাঁদের খোঁজখবর নেবেন। রাজনৈতিকভাবে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভোটের ফল প্রকাশের পর অভিষেকের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বেলেঘাটার তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। ঘটনাচক্রে, নিজের সফরের প্রথম দিনেই কুণালের নির্বাচনী এলাকায় পা রাখছেন অভিষেক, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
এতদিন রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ 'জেড প্লাস' ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পেতেন ডায়মন্ড হারবারের এই সাংসদ। তবে রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর নতুন সরকারের নিয়ম মেনে তাঁর নিরাপত্তা কাটছাঁট করা হয়েছে। একজন সাধারণ সাংসদ হিসেবে যেটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেইটুকু নিয়েই শনিবার কালীঘাটের চেনা গণ্ডির বাইরে পা রাখছেন তিনি। ভোটের আগে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে তাঁর করা 'ফলতায় বৈদ্যুতিক চুল্লি করে দেব' মন্তব্যের জেরে ইতিমধ্যেই এফআইআর হয়েছে, আবার তাঁর বাসভবনের বেআইনি অংশ ভাঙতে পুরসভা থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে চরম চাপের মধ্যেই এই মরণপণ লড়াইয়ে নামছেন তিনি।
বিজেপির বিপুল জয়ের পর থেকে অভিষেকের বহুপ্রচারিত 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলের ভেতরেরই একাংশ। কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শান্তনু সেনের মতো নেতারা, যাঁরা একসময় অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন তাঁরাও এখন দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক এবং অভিষেকের রণকৌশলকে কাঠগড়ায় তুলছেন। এমনকি ফলতার পুনর্নির্বাচনেও প্রচারে যাননি অভিষেক, যার ফলে সেখানে তৃণমূল প্রার্থী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোয় দল চতুর্থ স্থানে নেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শনিবারের সফর থেকে অভিষেক নিজের দলের এই বিক্ষুব্ধ 'বেসুরো' নেতাদের উদ্দেশ্যে নতুন কোনও কড়া বার্তা দেন কি না, সেদিকেই নজর সকলের।
তৃণমূল সাংসদের এই কর্মসূচিকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যের নতুন শাসকদল বিজেপি। তাদের বক্তব্য, বিজেপি সরকারে আসার পর রাজ্যে কোনও রাজনৈতিক হিংসায় মদত দেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৃণমূল নেতাদের ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এর দায় তৃণমূলেরই। ফলে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।
ভোটের ফল ঘোষণার পর তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি যখন কার্যত ছন্নছাড়া, তখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সফরকে সংগঠনকে নতুন করে চাঙ্গা করার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে দলের ভেতরে বিদ্রোহের আগুন, আর অন্যদিকে চেনা নিরাপত্তা হারিয়ে ক্ষমতা হারানো সেনাপতির মতো ময়দানে নামা, সব মিলিয়ে শনিবারের এই হাই-ভোল্টেজ সফর ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে।
-জ্যোতি সরকার

