তৃণমূলের অন্দরমহলের বিবাদ এবার আক্ষরিক অর্থেই দিল্লির দরবারে। একদিকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়দের 'বিদ্রোহ', অন্যদিকে সংবিধানের ধারা ও দলত্যাগ বিরোধী আইনকে হাতিয়ার করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা ওপেন চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সংসদ ভবনের কক্ষকে কেন্দ্র করে শুক্রবার দিনভর টানটান উত্তেজনা বজায় রইল জাতীয় রাজনীতিতে।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার। হঠাৎ করেই স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ ব্লকের সাংসদেরা। সুদীপ-কাকলি-শতাব্দী রায়রা স্পিকারকে চিঠি দিয়ে সাফ জানিয়ে দেন, তাঁরা যোগ দিতে চলেছেন 'NCPI'-তে। এই খবর কলকাতায় পৌঁছতেই নড়েচড়ে বসে কালীঘাট। দলীয় কোন্দল সামাল দিতে এবং পাল্টা চাপ তৈরি করতে তড়িঘড়ি স্পিকারকে চিঠি পাঠায় 'কালীঘাট-তৃণমূল'। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই চিঠি স্পিকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তৃণমূলের দুই সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষ। চিঠিতে অভিষেকের স্পষ্ট আবেদন ছিল, বিক্ষুব্ধদের ব্যাপারে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্পিকার যেন তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
অভিষেকের সেই চিঠির ভিত্তিতেই আজ, শুক্রবার তাঁকে দিল্লিতে তলব করেছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। তৃণমূলের আসল পরিস্থিতি ঠিক কী, তা বুঝতেই এই হাইভোল্টেজ বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়। তবে একা নন, দিল্লির বুকে কালীঘাট শিবিরের শক্তি প্রদর্শন করতে আজ ওম বিড়লার ঘরে একঝাঁক হেভিওয়েট সাংসদকে নিয়ে হাজির হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, ডেরেক ও'ব্রায়েন এবং মহুয়া মৈত্র।
সূত্রের খবর, এ দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রণংদেহী মেজাজে পাওয়া যায় ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে। স্পিকারের সামনে খোদ দেশের সংবিধান খুলে ধরেন অভিষেক। স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেন, আইন মোতাবেক দল না ভেঙে বা নির্দিষ্ট সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছাড়া আলাদা করে কোনো 'ব্লক' তৈরি করা যায় না। দলত্যাগ বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ধারাগুলি স্পিকারকে মনে করিয়ে দেন তিনি। আইনি মারপ্যাঁচে সুদীপ-কাকলিদের পদক্ষেপ যে সম্পূর্ণ অবৈধ, তা-ই কার্যত তথ্যসহকারে দাবি করে কালীঘাট শিবির।
বৈঠক শেষে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়েই বিক্ষুব্ধ শিবিরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সুদীপ-কাকলিদের নাম না করে সরাসরি ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে তিনি বলেন, "পদ ছাড়তে হবে, যদি ক্ষমতা থাকে তবে তৃণমূলের সাংসদ পদ ছেড়ে দিয়ে বিজেপির টিকিটে নতুন করে জিতে দেখান।"
একদিকে সুদীপ-কাকলিদের দিল্লিতে গিয়ে দলবদলের তৎপরতা, অন্যদিকে সংবিধানের ধারা মনে করিয়ে কালীঘাটের এই পাল্টা আক্রমণের জেরে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দ এখন সরগরম। দলত্যাগ বিরোধী আইনের বেড়াজালে আটকে পড়া এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত স্পিকার ওম বিড়লা কী সিদ্ধান্ত নেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
-অঙ্কিতা পাল

