বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই 'আসল' তৃণমূল কারা, এই প্রশ্নে আড়াআড়ি বিভক্ত রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। একদল মমতার অনুগামী 'কালীঘাটপন্থী', অন্যদল 'বিদ্রোহী' ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাইন। প্রতীক, নাম এবং দলের তহবিল নিয়ে যখন টানাপড়েন সুপ্রিম কোর্ট থেকে নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছে, ঠিক তখনই শুক্রবার কলকাতার মেট্রোপলিটনে তৃণমূলের প্রধান দলীয় কার্যালয় 'দখল' করল ঋতব্রত শিবির।
আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শুক্রবার চরম নাটকীয়তার সাক্ষী থাকল রাজ্য রাজনীতি।
এ দিন ঋতব্রতের সঙ্গে কার্যালয় দখলে হাজির ছিলেন ফিরহাদ (ববি) হাকিম, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান এবং আখরুজ্জামানের মতো একঝাঁক বিধায়ক। কার্যালয়ে ঢুকেই তাঁরা ভবনের বাইরের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। এই খবর চিলির মতো ছড়াতেই ঘটনাস্থলে বিদ্যুৎবেগে পৌঁছে যান কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের মুখপাত্র তথা স্থানীয় বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর বিধানসভা এলাকাতেই এই কার্যালয়টি হওয়ায় রাজনৈতিক পারদ চড়তে সময় নেয়নি।
মেট্রোপলিটনের এই পার্টি অফিস দখল নিয়ে কুণাল ঘোষ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "রাজ্যে পুরোপুরি দখলদারির সংস্কৃতি চলছে। সরকার এবং পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতে একজন বহিষ্কৃত নেতা বিজেপির 'বি টিম' হয়ে ময়দানে নেমেছে।" পাল্টা জবাবে ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, "আমরাই আসল তৃণমূল। এই কার্যালয়ের সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। আমরা ভবনের মালিকের সঙ্গে কথা বলেই আইনত এখানে এসেছি, ভাড়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।"
তৃণমূলের অন্দরের এই গৃহযুদ্ধ গত ২১ জুন অন্য মাত্রা পেয়েছিল, যখন নিউ টাউনের এক হোটেলে বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে 'তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতি' গঠন করে ফেলেন ঋতব্রতেরা। সেই নয়া কমিটিতে তৃণমূলের চেয়ারম্যান করা হয় হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়কে। এ দিন মেট্রোপলিটনের কার্যালয় দখলের সময় ঋতব্রতেরা সঙ্গে করে একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসেছিলেন, যেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে জ্বলজ্বল করছে অরূপ রায়ের নাম। সেটি সটান টাঙিয়ে দেওয়া হয় অফিসের বাইরে।
তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মেট্রোপলিটনের এই কার্যালয় জুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অজস্র ছবি এবং কাটআউট থাকলেও, সেগুলিতে হাত দেননি ঋতব্রতপন্থীরা। বরং সুকৌশলে তাঁরা বার্তা দিয়েছেন, মমতাকে তাঁরা দলের 'পরামর্শদাতা' হিসেবে রেখেই এগোতে চান। কিন্তু দলের রাশ এবং প্রতীক যে তাঁদের হাতেই থাকা উচিত, তা স্পষ্ট করে ঋতব্রত বলেন, "দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী, কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদের সদস্যরা আমাদের সঙ্গে আছেন। তাই বিতর্কের কোনও অবকাশই নেই।" উল্লেখ্য, প্রতীক ও তহবিলের দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবারই দিল্লির নির্বাচন কমিশনের ফুলবেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিল এই বিদ্রোহী শিবির।
এমনকি আগামী ২১ জুলাইয়ের শহীদ দিবস সমাবেশ নিয়েও দুই শিবিরের বাগযুদ্ধ চরমে উঠেছে। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল দু-পক্ষই, যদিও কলকাতা পুলিশ কাউকেই অনুমতি দেয়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই কার্যালয় হাতছাড়া হওয়া কালীঘাট শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ, মেট্রোপলিটনের এই ভবনের মালিক মনোতোষ সাহা ওরফে মন্টু সাহা (মডার্ন ডেকরেটিং)-র সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ধর্মতলার ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ বাঁধা থেকে দলের সমস্ত বড় কর্মসূচির দায়িত্ব থাকত তাঁর ওপর। নির্বাচনের পর সমীকরণ বদলে যাওয়ায় মন্টুবাবু ভবন খালি করার নোটিশ দিয়েছিলেন। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই মন্টুবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে শুক্রবার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিল ঋতব্রত-ফিরহাদ শিবির। এখন এই 'দলীয় কার্যালয় যুদ্ধ' আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
- অঙ্কিতা পাল

