রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলা নানা ঘটনার পর অবশেষে দিল্লিতে সম্পন্ন হল বহু প্রতীক্ষিত সেই বৈঠক। মঙ্গলবার দিল্লির বঙ্গভবনে এনসিপিআই (NCPI MP) সাংসদদের মুখোমুখি হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
দল ভাঙন এবং পরবর্তী সময়ে এনডিএ জোটভুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম বার একসঙ্গে এনসিপিআই সাংসদদের সঙ্গে বৈঠক করলেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই বৈঠকে নিজ নিজ লোকসভা কেন্দ্রের উন্নয়নমূলক রণকৌশল, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং আগামী দিনের দিকনির্দেশ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে সাংসদদের চোখেমুখে দেখা গেল সন্তোষের ছাপ।
গত জুন মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলে ব্যাপক ভাঙন ধরার সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে এক বিশেষ বৈঠক হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে এনসিপিআই গঠন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, দেব কিংবা ইউসুফ পাঠানদের যোগদান এবং দলটির আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিএ জোটভুক্ত হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের আর একান্তে দেখা হয়নি। যদিও এর মাঝে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদার নবান্নে গিয়ে পৃথক ভাবে দেখা করে এসেছিলেন এবং কাকলি এনসিপিআই-কে শক্তিশালী করতে দূত হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। মঙ্গলবার বঙ্গভবনে এনসিপিআই ও বিজেপি নেতৃত্বের যৌথ উপস্থিতি সেই সমস্ত জল্পনায় যেন এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
মঙ্গলবারের এই বিশেষ বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। বৈঠকটিতে সব মিলিয়ে ২২ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে ১৯ জন ছিলেন এনসিপিআই-এর শীর্ষ সাংসদ এবং তৃণমূলত্যাগী রাজ্যসভার তিন বিজেপি সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক। নির্ধারিত সময় দুপুর ১টায় বৈঠক শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অরবিন্দ কেজরীবালের একটি কর্মসূচির কারণে সৃষ্ট যানজটে কিছুটা দেরিতে বঙ্গভবনে পৌঁছান শুভেন্দু। বৈঠকের পর তিনি নিজে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ না খুললেও, সাংসদেরা বৈঠকের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন।
বৈঠক শেষে সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এটিকে "দীর্ঘ দিন ধরে বকেয়া থাকা এক ফলপ্রসূ বৈঠক" হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, নিজ এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে ঘরছাড়া সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তাঁরা নির্ভয়ে এগিয়ে আসেন এবং রাজ্য সরকার সর্বদা তাঁদের পাশে থাকবে বলে জানান। অপর সাংসদ বাপী হালদারও নিশ্চিত করেন, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ও প্রকল্পের সুবিধা যাতে কোনও যোগ্য ব্যক্তি থেকে বঞ্চিত না হন, তা সরাসরি চিহ্নিত করে সমাধান করবেন সাংসদেরা। এনসিপিআই ও এনডিএ জোট ঘিরে নানা রাজনৈতিক বিভ্রান্তি উড়িয়ে দিয়ে তিনি জানান, সব সাংসদই শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।
তবে বৈঠকের সুর পুরোপুরি রাজনৈতিক কি না, তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত দেখা গেছে সাংসদদের কথায়। সাংসদ জুন মালিয়া এই আলোচনাকে "অত্যন্ত সফল ও গঠনমূলক" বলে অভিহিত করে প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস পাওয়ার কথা বললেও, প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় বৈঠকটিকে নিতান্তই একটি 'সৌজন্য সাক্ষাৎ' বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, লোকসভা ও রাজ্যসভা কেন্দ্রগুলির উন্নয়ন রূপরেখা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে। সাংসদ শতাব্দী রায়ও জানান, দলীয় রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কিছু কথা না হলেও এলাকার কাজ নিয়েই কথা হয়েছে এবং আগামী দিনে তাঁরা নবান্নে গিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। অন্যদিকে, এনসিপিআই বিজেপির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কি না এই প্রশ্নে সব সাংসদই মুখ বন্ধ রাখলেও, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের "আমরা ২০ জনই আছি, সংখ্যাটা বাড়তেও পারে" শীর্ষক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা উস্কে গিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, মঙ্গলবার সকালে দিল্লিতে এনডিএ-র মূল বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন এনসিপিআই-এর তিন সাংসদ আবু তাহের, খলিলুর রহমান ও ইউসুফ পাঠান। এনডিএ-র বৈঠকে না থাকা প্রসঙ্গে আবু তাহের স্পষ্ট জানান, তাঁরা এনডিএ বা বিজেপি কোথাও নেই। তবে বঙ্গভবনে শুভেন্দুর ডাকা বৈঠকে এই তিন সাংসদই উপস্থিত ছিলেন। সব মিলিয়ে, বঙ্গভবনের এই এক ঘণ্টার বৈঠক রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ এবং সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন, উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
-অঙ্কিতা পাল

