Bombay High Court: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে এক রাজনৈতিক কর্মীকে শহর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ায় মুম্বই পুলিশের কঠোর সমালোচনা করল বম্বে হাইকোর্ট। আদালত এই নির্বাসনের নির্দেশ বাতিল করার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দিয়ে পুলিশ কী তাঁদের 'সরকারের দাসে' পরিণত করার চেষ্টা করছে।
বম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি মাধব জে জামদার এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে পুলিশকে মনে করিয়ে দেন যে তাঁরা জনগণের সেবক, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনুগত দাস নন। রায় দেওয়ার সময় আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা ভারতের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এসডিপিআই)-এর ৪৯ বছর বয়সি সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মুম্বই পুলিশ একটি বিশেষ নির্দেশের মাধ্যমে তাঁকে এক বছরের জন্য শহর থেকে নির্বাসিত করে। পুলিশের দাবি ছিল, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছিল।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), বাবরি মসজিদ এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ-সংক্রান্ত নানা বিতর্কিত ইস্যুতে মুম্বই পুলিশের অনুমতি ছাড়াই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন ওয়াহিদ চৌধুরী। পুলিশের দায়ের করা মামলার অনুযায়ী, ওই সব বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রতিবাদীরা 'বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ' এবং 'অমিত শাহ মুর্দাবাদ' স্লোগান দিয়েছিলেন। তবে চৌধুরী শুরু থেকেই একে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে দাবি করে আসছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় পৌরসভা নির্বাচন থেকে তাঁকে দূরে রাখতে এবং গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতেই পুলিশ এই পদক্ষেপ করেছিল।
ভারতে সাধারণত দাগি অপরাধী কিংবা সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের সাময়িকভাবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকা থেকে দূরে রাখতে এই বিশেষ ও কঠোর আইনি ব্যবহার করা হয়। ওয়াহিদ চৌধুরীর আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে যে সব মামলা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত ছোটখাটো অভিযোগ এবং এগুলোর সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র এক মাসের কারাদণ্ড হতে পারত। এমন সাধারণ অভিযোগে কোনও নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া আইনসম্মত হতে পারে না। অন্যদিকে, রাজ্য সরকার পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে যুক্তি দেয়, পুলিশ বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা সত্ত্বেও অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করার কারণেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
তবে বিচারপতি মাধব জে জামদার তাঁর রায়ে বলেন, পুলিশের এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত 'দুরভিসন্ধিমূলক' এবং এর পেছনে কোনও বাস্তব আইনি ভিত্তি ছিল না। চৌধুরী জননিরাপত্তা বা রাষ্ট্রের সম্পদের জন্য কোনও ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন-এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ পুলিশ আদালতে পেশ করতে পারেনি। মামলার শুনানিতে বিচারপতি মাধব জামদার স্পষ্ট জানান, সংবিধানের ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছেদ অনুসারে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সরকারের কোনও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা বা শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও বৈধ প্রক্রিয়া। কেবলমাত্র এই কারণে কোনও ব্যক্তিকে নির্বাসিত করা তাঁর মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আদালত জানায়, সরকার বিরোধী মত প্রকাশ বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ।

