অন্তরা ত্রিপাঠী | সম্পাদক, আইবিজি নিউজ বাংলা
গৌহাটি, ১ আগস্ট ২০২৬: ভারতের প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ-এর গৌহাটি পর্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো শনিবার ইন্দিরা গান্ধী অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি আসামের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস এবং এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্টের উত্তরাধিকারকে এক মঞ্চে তুলে ধরে।
এরপরই অনুষ্ঠিত হয় গ্রুপ-এফ-এর উদ্বোধনী ম্যাচ, যেখানে মুখোমুখি হয় গতবারের চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি এবং বোদোল্যান্ড এফসি।
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও অসম সরকারের যৌথ সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসম সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী বিশ্বজিৎ দৈমারি, অর্থ, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী জয়ন্ত মল্লবড়ুয়া, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের বিশেষ সচিব কে. জে. হিলালি, পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের জিওসি-ইন-সি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভি. এম. বি. কৃষ্ণন, চতুর্থ কোরের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল নীরজ শুক্লা, বেঙ্গল সাব এরিয়ার জিওসি মেজর জেনারেল দিনেশ কুমার সিং, ২১ মাউন্টেন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রোহিন বাওয়া, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান অরবিন্দর সিং সাহনি-সহ সেনা, প্রশাসন, ফুটবল সংগঠন, অংশগ্রহণকারী ক্লাব এবং স্পনসর সংস্থার বহু বিশিষ্ট প্রতিনিধি।
মূল অনুষ্ঠানের আগে দর্শকদের জন্য ছিল একাধিক আকর্ষণ। স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে বাঁধা হট-এয়ার বেলুন, মিলিটারি জ্যাজ ব্যান্ডের সুর, আর্মি ব্রাস ও পাইপ ব্যান্ডের যৌথ পরিবেশনা, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত কুকুরের প্রদর্শনী এবং ডুরান্ড কাপের ইতিহাস ও ট্রফি সফর নিয়ে বিশেষ ভিডিও প্রদর্শন দর্শকদের মুগ্ধ করে।
প্রধান অনুষ্ঠান শুরু হয় বিশিষ্ট অতিথিদের আগমনের মাধ্যমে। তাঁদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার পর সম্মিলিত সামরিক ব্যান্ড এবং এনসিসি অল গার্লস ব্রাস ব্যান্ড-এর মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা স্টেডিয়ামের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এরপর আকাশে রোমাঞ্চকর স্কাইডাইভিং প্রদর্শনের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল ম্যাচ বল এবং তিনটি ঐতিহ্যবাহী ডুরান্ড ট্রফি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করা হয়।
এরপর মঞ্চজুড়ে উঠে আসে আসামের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি। বাগুরুম্বা, বারদ্বি শিখলা, বিহু এবং ভোরতাল নৃত্যের বর্ণিল পরিবেশনা রাজ্যের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। পাশাপাশি ছিল প্যারামোটর ও অ্যারোমডেলিং প্রদর্শনী এবং সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী উপস্থাপনা 'বাদলুরাম কা বদন'। অনুষ্ঠানের আরও একটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার (ALH)-এর ফ্লাইপাস্ট।
দর্শকদের জন্য আরও ছিল কেরলের ঐতিহ্যবাহী চেন্ডা বাদ্য এবং প্রাচীন ভারতীয় মার্শাল আর্ট কলারিপায়ত্তু-এর মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী। এরপর প্রদর্শিত হয় বিশেষভাবে নির্মিত ডুরান্ড কাপ থিম ভিডিও, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পর্বে পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের পতাকা, ডুরান্ড কাপের পতাকা এবং অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের ফেয়ার প্লে পতাকা মাঠে আনা হয়। পরে দুই দলের খেলোয়াড় ও ম্যাচ অফিসিয়ালরা মাঠে প্রবেশ করেন। প্রধান অতিথি ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা খেলোয়াড় ও রেফারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং স্মারক দলগত আলোকচিত্রে অংশ নেন।
শেষপর্যন্ত প্রধান অতিথির আনুষ্ঠানিক কিক-অফের মাধ্যমে গৌহাটি পর্বের উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে তোলে ভারতীয় বায়ুসেনার সু-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানের চমকপ্রদ ফ্লাইপাস্ট। পরে অতিথিরা ডুরান্ড কাপের তিনটি ঐতিহ্যবাহী ট্রফির সঙ্গে আলোকচিত্রে অংশ নেন। এরপর শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত উদ্বোধনী ম্যাচ।
এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান প্রমাণ করে যে, ডুরান্ড কাপ শুধুমাত্র একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভারতের সামরিক ঐতিহ্য, জাতীয় সংহতি এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলা। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে এই প্রতিযোগিতার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেশের ফুটবল বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডুরান্ড কাপ এশিয়ার প্রাচীনতম এবং বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম জীবিত ফুটবল প্রতিযোগিতা। সামরিক ঐতিহ্য থেকে জন্ম নেওয়া এই টুর্নামেন্ট আজ ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে পরিণত হলেও তার ঐতিহাসিক পরিচয় ও গৌরব অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ ২৫ জুলাই থেকে ২৩ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত কলকাতা, গৌহাটি, শিলং, রাঁচি এবং ইম্ফল-এই পাঁচটি আয়োজক শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মোট ২৪টি দল, যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা সশস্ত্র বাহিনীর একটি দলও অংশ নিচ্ছে। ছয়টি ভেন্যুতে মোট ৪৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতার সমস্ত ম্যাচ Sony LIV-এ সরাসরি স্ট্রিমিং করা হচ্ছে এবং Sony Ten 5 HD ও SD চ্যানেলে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

